অনুসন্ধানী প্রতিবেদক:
ভাটারা থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) সুজন হক একাই জুলাই-আগষ্ট বিপ্লবের ডজন খানেক হত্যা মামলা ধামাচাপা দেওয়ার পায়তারা চালাচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার নিষেধাজ্ঞার কারণেই সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তদন্তকারী কর্মকর্তারা চিহ্নিত খুনিদের গ্রেফতার করতে পারছেন না এমনকি আদালতে দাখিল করতে পারছেন না তদন্ত প্রতিবেদনও।
আওয়ামীলীগের সহযোগী হিসেবে পরিচিত দাপুটে ওই ইন্সপেক্টর (তদন্ত) শুধু ভাটারা থানাতেই নয়, গুলশান, বাড্ডা, রামপুরা ও যাত্রাবাড়ী থানাতেও ছাত্র-জনতা হত্যা মামলা নিয়ে তদবিরবাজী করছেন বলে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি তদন্তাধীন মামলা থেকে আসামিদের নাম কেটে ফেলা, লিপিবদ্ধ নামের সাথে ভুল ঠিকানা যুক্ত করা কিংবা বাদী দ্বারা হলফনামার মাধ্যমে চিহ্নিত আসামিদের রেহাই দেওয়ার পায়তারায় লিপ্ত রয়েছেন।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে বিশেষ সুবিধায় সুজন হক পুলিশে চাকুরি লাভ করেন। ফ্যাসিস্ট আমলের টানা কয়েক বছর শরিয়তপুরের জাজিরা থানায় চাকরির সুবাদে সেখানকার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি হয়। সম্পর্কের
প্রতিদান স্বরূপ রাজধানীর থানাগুলোর যে-সব মামলায় শরিয়তপুরের লীগ নেতা কর্মীরা আসামি হয়েছেন সেসব মামলার খোজ খবর নিচ্ছেন এবং যে কোন মূল্যে তাদের মামলামুক্ত করার কাজে তৎপর রয়েছেন।
বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনকালে রাজধানীর ভাটারায় ফ্যাসিবাদীদের গুলিতে নিহত ছাত্র ইমন (১৭) হত্যার মামলা ধামাচাপা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ইন্সপেক্টর (তদন্ত) সুজন হকের নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, তিনিসহ একটি চক্র ওই হত্যা মামলার শতাধিক আসামি থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিপরীতে তাদেরকে সুরক্ষা দিচ্ছেন। মামলার তদন্তকারী অফিসার এসআই হাসানের কর্মকাণ্ডে তিনি বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন, কোনো আসামিকে গ্রেফতার করতেও দিচ্ছেন না। আসামিদের গ্রেফতারের জন্য থানার টিম অভিযানে নামলেই ইন্সপেক্টর (তদন্ত) সুজন হক তার ব্যক্তিগত মোবাইল থেকে সতর্ক বার্তা পাঠান মর্মেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
মামলা সূত্রে জানা যায়, জুলাই বিপ্লবের উত্তাল আন্দোলন চলাকালে ১৯ জুলাই সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে ভাটারা ১০০ ফুট রাস্তার বায়তুল মামুর জামে মসজিদের সামনে আওয়ামী ফ্যাসিবাদীদের উপর্যুপরি গুলিতে গুরুতর আহত হন ইমন। একই মেস রুমে থাকা ইমনের আপন খালাতো ভাই নয়ন মিয়া জাবেদসহ আশপাশের লোকজন তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩ আগস্ট রাত সোয়া তিন টায় চিকিৎসকরা ইমনকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। শহীদ ইমনের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগর থানার চনপুর গ্রামে, তার বাবার নাম মো. সেলিম মিয়া বলে জানা গেছে।
মেধাবী ছাত্র ইমন হত্যার ঘটনায় তার আপন খালাতো ভাই নয়ন মিয়া জাবেদ বাদী হয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালতের আদেশে ভাটারা থানায় একটি হত্যা মামলা (নং-৩৩/৮৫ ধারা ৩০২/১৪৯/৩৪ পেনাল কোড) রুজু হয়। মামলায় শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, সজীব ওয়াজেদ জয়সহ মোট ১১৫ জনের নাম উল্লেখ করে আসামি দেওয়া হয়। এরমধ্যে শরীয়তপুর জাজিরা থানাধীন আওয়ামী লীগের দুর্ধর্ষ ৫ ক্যাডারের নাম আসামির তালিকায় ছিল। জাজিরা থানা থেকেই সদ্য বদলি হয়ে আসা, আওয়ামী দোসর হিসেবে চিহ্নিত ইন্সপেক্টর (তদন্ত) সুজন হক ভাটারা থানায় যোগদান করায় আসামিদের জন্য তা পোয়াবারো হয়ে দাঁড়ায়। জাজিরা এলাকার চিহ্নিত আসামিরা ঐ হত্যা মামলার বাকি আসামিদের সাথে ইন্সপেক্টর (তদন্ত) সুজন হকের গোপন সম্পর্ক তৈরি করে দেন। তারা মাথাপিছু ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা তুলে ইন্সপেক্টর সুজন হকের প্রায় অর্ধকোটি টাকার দাব মিটিয়েছেন।
ইন্সপেক্টর (তদন্ত) সুজন হকের দাবি, তিনি আসামিদের থেকে উত্তোলন করা টাকা ভাটারা থানার অফিসার ইনচার্জ, বাড্ডা সার্কেলের এসি, গুলশানের ডিসিসহ ডিএমপি পুলিশের একজন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারকে ভাগবন্টন করে দিয়েছেন। এছাড়া কয়েকজন সমন্বয়কের হাতে মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়া হয়েছে বলেও আসামিদের জানিয়েছেন ইন্সপেক্টর সুজন। এসব লেনদেনের বিপরীতে আসামিদের গ্রেফতারমুক্ত থাকার সুবিধা প্রদানের পাশাপাশি মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তাদের রেহাই দেওয়ার উপায় বের করবেন। একইভাবে ওই ইন্সপেক্টরের প্রভাবে ভাটারা থানায় রুজু হওয়া কিশোর সোহাগের মামলা তদন্তের কার্যক্রমও ঝিমিয়ে পড়েছে। গত ১৯ জুলাই ভাটারা থানা এলাকায় সোহাগ মিয়া (১৬) নামের এক কিশোর পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। নিহতের বাবা শাফায়েত হোসেন ২০ আগস্ট ভাটারা থানায় একটি হত্যা মামলা করেন, যেখানে আ স ম আসম ফিরোজসহ ৯১ জনকে আসামি করা হয়। ইন্সপেক্টর সুজন হকের তদবিরবাজীর হাত পড়েছে বাড্ডা থানাতেও। গত ২০ ও ২১ আগস্ট ২০২৪ তারিখে ভিকটিম হাফিজুল ও সুমন শিকদার হত্যার ঘটনায় বাড্ডা থানায় রুজু হওয়া দুটি পৃথক মামলার ক্ষেত্রেও ৭/৮ জন আসামিকে রেহাই দেওয়ার মিশন চালাচ্ছেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ইন্সপেক্টর (তদন্ত) সুজন হক বলেন, জুলাই-আগষ্ট আন্দোলন কেন্দ্রিক হত্যা মামলাগুলো সতর্কতার সাথে তদন্ত করতে হচ্ছে। বিশেষ করে এসব মামলায় নির্দোষ কাউকে হয়রানি বা গ্রেফতার করা থেকে বিরত থাকার জন্য পুলিশ সদর দপ্তর থেকেও নির্দেশনা রয়েছে। এ অবস্থায় মামলার বাদীরা এসে আসামিদের ঘুরে বেড়ানোর নানা তথ্য দিলেও তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আরো জানান, বাদীদের তথ্যানুযায়ী আসামিদের গ্রেফতার না করায় অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়ে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা, ভিত্তিহীন নানা অভিযোগ তুলছে।
প্রকাশক : শহিদুল ইসলাম
সম্পাদক : এম,এস,এ রেজা
প্রকাশক : 01746808322
সম্পাদক : 01712340047
ইমেইল : dailyajkersongram@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক আজকের সংগ্রাম. All rights reserved.