মোঃ মাসুদ বিপ্লব,
ঠাকুরগাঁও
ঠাকুরগাঁও শহরের প্রাণকেন্দ্রে গত ১৩ মে মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে “অভিভাবকহীন শিল্পপণ্য বাণিজ্য মেলা-২০২৫”। তবে মেলা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে নানা বিতর্ক, প্রশ্ন ও জনসাধারণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ—মেলার আয়োজন যথাযথ পরিকল্পনা ও জনস্বার্থ বিবেচনা না করে করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থী, কৃষক, সাধারণ ব্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষদের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, আগামী ২৪ এপ্রিল থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। ঠাকুরগাঁও পৌর এলাকার দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা কেন্দ্র—ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ ও সরকারি মহিলা কলেজ—মেলার আশপাশে অবস্থিত। পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ, মেলার কারণে প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে তাদের। প্রচণ্ড ভিড়, শব্দ দূষণ ও নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা দেওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বলে অভিভাবকদের অনেকেই মন্তব্য করেছেন। ঠাকুরগাঁওয়ে অভিবাবকহীন শিল্পপন্য বানিজ্য মেলার জমকালো প্রবেশদ্বার - আলো ঝলমলে আয়োজনের আড়ালে শিক্ষার্থী, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ। তাছাড়া মেলা বহিরাঙ্গন আকর্ষণীয় হওয়ার নেপথ্যে সাধারণ মানুষের অভিযোগ বিশৃঙ্খলা, জনদুর্ভোগ এবং নীতিগত অবহেলা, অপরদিকে শহীদ স্মৃতি স্তম্ভের পাশে মেলার সম্প্রসারণ যা জনমনে নানান ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এধরনের নির্মাণকে অনেকেই একে শহীদের প্রতি অবমাননা হিসেবে দেখছেন। এর মাধ্যমে স্মৃতি চিহ্নের মর্যাদা এবং এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়েছে।এর ফলে সব শ্রেণীর মানুষের মাঝে প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
মেলার জন্য নির্ধারিত মাঠটি সাধারণত বহুমুখী ব্যবহারে ব্যবহৃত হয়। প্রতি শুক্র ও শনিবার এই মাঠে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ‘কৃষকের বাজার’ বসে থাকে, যা স্বল্প আয়ের মানুষ ও স্থানীয় কৃষকদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প বাজার। কিন্তু মেলার কারণে এই বাজার বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে কৃষকরা যেমন বিক্রির সুযোগ হারাচ্ছেন, তেমনি সাধারণ মানুষও সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপণ্য কিনতে পারছেন না। এতে করে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ ও স্থানীয় উৎপাদকরা।
মেলার নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার নামে চারপাশে ঘেরা বাউন্ডারি দেওয়ায় বাধাগ্রস্ত হয়েছে আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে প্রবেশ ও চলাচল। ঠাকুরগাঁও অডিটোরিয়াম ও প্রেস ক্লাবের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটছে। অনুষ্ঠান, সেমিনার, প্রেস কনফারেন্স আয়োজন করতে গিয়ে সংশ্লিষ্টরা নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
মেলার সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনা হলো শহরের গৌরব ‘শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ’-এর ওপর মেলা কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মেলার জায়গা সম্প্রসারণের জন্য স্তম্ভটির ভিত্তিপ্রস্তর ভেঙে ফেলা হয়েছে। এ ঘটনাকে শহীদদের প্রতি চরম অবমাননা ও ইতিহাস বিকৃতি হিসেবে দেখছেন সচেতন নাগরিকরা। ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিবাদ দেখা দিয়েছে এবং মেলার স্থান পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা—বিশেষত হকার, পোশাক ও জুতা ব্যবসায়ীরা—মেলার কারণে কুরবানির ঈদের আগে বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন। তারা বলছেন, মেলা মানুষকে বিভ্রান্ত করছে এবং শহরের প্রচলিত বাজারের ক্রেতা সরিয়ে নিচ্ছে। ঈদের আগে এই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা সম্ভব না হলে ব্যাংক ঋণ ও এনজিওর কিস্তি পরিশোধে তারা চরম বিপাকে পড়বেন।
এতোসব বিতর্ক ও অভিযোগের পরও এখন পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করছে, বিষয়টি এখনই আমলে না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। মেলা আয়োজক কমিটি এবং জেলা প্রশাসন জনরোষের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—উন্নয়নের নামে যদি শিক্ষার্থী, কৃষক, শহীদদের স্মৃতি এবং সাধারণ জনগণের জীবনমানকে অবহেলা করা হয়, তবে এই দায় কে নেবে? মেলার নামে যদি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ক্ষুণ্ণ হয়, তবে তার বিচার হবে কীভাবে?
এই অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে ঠাকুরগাঁওয়ের সচেতন নাগরিক সমাজ। তারা অনতিবিলম্বে মেলার স্থান পরিবর্তন অথবা মেলা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন, যাতে জনজীবনে স্বাভাবিকতা ফিরে আসে এবং পরীক্ষার্থীদের সুষ্ঠু পরিবেশে পরীক্ষা নিশ্চিত করা যায়।
প্রকাশক : শহিদুল ইসলাম
সম্পাদক : এম,এস,এ রেজা
প্রকাশক : 01746808322
সম্পাদক : 01712340047
ইমেইল : dailyajkersongram@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক আজকের সংগ্রাম. All rights reserved.