
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা ও পুনর্বাসনে সরকার পরিচালিত বিশেষ বিদ্যালয় স্থাপন নিঃসন্দেহে একটি মানবিক উদ্যোগ। কিন্তু এই উদ্যোগকে ঘিরে ঠাকুরগাঁওসহ সারাদেশে গড়ে উঠেছে প্রভাবশালী এক সিন্ডিকেটের বাণিজ্য—যেখানে অসহায় ও অবুঝ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠছে। রাতারাতি ক্ষমতাবান মহলের আঁতাতে ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হয়ে উঠেছে কিছু অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।
জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন, প্রতিবন্ধী শিক্ষক–কর্মচারী কল্যাণ সমিতির কিছু নেতা, বিভিন্ন জেলা-উপজেলার সমাজসেবা কর্মকর্তাসহ সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা—সব মিলিয়ে একটি বড়সড় সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নিয়োগবাণিজ্য, অনুদান লোপাট ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
চাকরির আশায় অনেকে ভিটেমাটি বিক্রি করে গৃহহীন, ঋণগ্রস্ত ও সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেও মুখ খুলছেন না চাকরির ‘সোনার হরিণের’ আশায়।
ঠাকুরগাঁও পৌর এলাকার মুন্সিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মিনতি সরকার ২৩ জুলাই ২০২৬ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন—তার স্বামী ও ছেলে ভ্যানচালক পদে চাকরির আশায় সুদে দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়ে স্কুল সভাপতির হাতে দেন। কিন্তু বেতন না পাওয়ায় পাওনাদারের চাপ বাড়তে থাকলে তারা টাকা ফেরত চান। এসময় কয়েকজন বকুল, ভুট্টু ও কামরুলের মাধ্যমে নিজেদের ‘সাংবাদিক’ পরিচয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার নামে সাক্ষাৎকার গ্রহণের নাটক সাজান।
স্থানীয়ভাবে আলোচিত এক নারী নেত্রী ( ফ্যাসিবাদীর দোসর)তাহমিনা মোল্লা ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে অনুদান বণ্টন, নিয়োগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় ক্ষমতার অপব্যবহারে জড়িত—এমন অভিযোগ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
তাদের যোগসাজশে ফ্রীড মাতৃ ছায়া অটিস্টিক শিশু নিকেতন — বিদ্যালয়ে অবৈধভাবে ১২৩ জন শিক্ষক - কর্মচারী নিয়োগের প্রস্তাব ঢাকায় পাঠানো হয়েছে বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। নিয়োগ বৈধ করার জন্য নাকি গোপনে ভুয়া প্রতিবেদন তৈরি করে কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত ৯ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখের নিয়োগ সভার কার্যবিবরণীতে ১৭ জন যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করে অনুমোদন দেওয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির কাটিং চাইলে সংশ্লিষ্ট অফিস কর্মকর্তা মোছাঃ সাইয়েদা সুলতানা তা দেখাতে ব্যর্থ হয়, সত্যায়িত ব্যাপারে বলেন,তিনি যথা নিয়মে সত্যায়িত করেছেন। এব্যাপারে জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ: আর মামুনের সাথে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি (০১৮১৯৬৬৬৭৩৪)।প্রাথমিক রেজুলেশনে ২৫ জনের নাম থাকলেও পরে বাদ–বিচার করে অন্য তালিকা যুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ গোলাম আযম ও অধ্যক্ষ তাহমিনা মোল্লার সাক্ষরে ৪৬ জন শিক্ষক - কর্মচারীর তালিকা বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা ২০০৯ অনুযায়ী বেতন স্কেলসহ অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়—যাদের কয়েকজন অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত।
২০২৩ সালের ২৯ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট মহিউদ্দীন আহমেদ প্রেরিত উকিল নোটিশের জবাবে সমাজসেবা কার্যালয় থেকে বিদ্যালয় পরিদর্শনের একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে—উক্ত প্রতিবেদনেও কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঠাকুরগাঁও জেলায় প্রায় ২৫টি প্রতিবন্ধী স্কুল চালু রয়েছে। কিন্তু প্রতিটি প্রতিবন্ধী শিশু কি এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা বা সেবা পাচ্ছে—তা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক প্রশ্ন। অনেকেই মনে করেন, অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে এসব স্কুলের মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জেলায় একমাত্র এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান ফ্রীড মাতৃ ছায়া অটিস্টিক শিশু নিকেতন —যেখানে নিয়মিত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৩০–৩৫ জন হলেও প্রথম রেজূলেশনভুক্ত ২৫ জন শিক্ষক–কর্মচারী ছিল। প্রতিষ্ঠানের জায়গা সংকুলান না হওয়ায় তাদের বসারও জায়গা অভাব দেখা গেছে। অভিযোগ রয়েছে—এ ছাড়া প্রস্তাবিত আরও ১০–১৫ জন কর্মচারীর ৫–৬ বছর ধরে কোনো হাজিরা নেই।
অভিযোগ সত্ত্বেও তদারকি ও যাচাই-বাছাইয়ের ঘাটতি থাকার পরও সর্বোচ্চ সুপারিশে ফাইলটি বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট–৯ শাখায় অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে গুঞ্জন আছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে—ফ্রীড মাতৃছায়া অটিস্টিক শিশু নিকেতনের সভাপতি স্থানীয় এক কলেজের অধ্যক্ষ, যিনি নিজেও অন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। একইভাবে কমিটির আরও কয়েকজন সদস্য বিভিন্ন বড় পদে নিযুক্ত। তাদের এই বহুমুখী ব্যস্ততা ও প্রভাবশালী অবস্থানকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অনিয়ম–দুর্নীতি সহজেই আড়ালে থেকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। উল্লেখ্য সার্বিক ভাবে অভিযোগের আঙুল উঠেছে - প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা ও কল্যাণের নামে গড়ে ওঠা একটি কল্যাণমূলক ব্যবস্থাকে দুর্নীতিবাজ কিছু ব্যক্তি রাতারাতি টাকার খনি বানিয়ে ফেলেছে। ভুক্তভোগীরা সরকার ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপের সাথে সাথে স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করেছেন।
প্রকাশক : শহিদুল ইসলাম
সম্পাদক : এম,এস,এ রেজা
প্রকাশক : 01746808322
সম্পাদক : 01712340047
ইমেইল : dailyajkersongram@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক আজকের সংগ্রাম. All rights reserved.