
ইকবাল হোসেন
ত্রিশাল
রাষ্ট্র কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; রাষ্ট্র গঠিত হয় মানুষের শ্রম, নিষ্ঠা ও দায়বদ্ধতার মাধ্যমে। সেই রাষ্ট্রযন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ সবচেয়ে নীরব চালিকাশক্তি হলো সরকারি কর্মচারীরা। দৃশ্যমান প্রশাসন থেকে শুরু করে অদৃশ্য কাঠামো—রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তম্ভই দাঁড়িয়ে আছে তাঁদের পরিশ্রমের ওপর। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়ন ও নির্বাচন—প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। অথচ আজ সেই কর্মচারীরাই ন্যায্য অধিকার আদায়ের দাবিতে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হচ্ছেন, যা কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে।
নবম পে-স্কেল কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনকে চরম চাপে ফেলেছে। বাসাভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, সন্তানের শিক্ষা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। কিন্তু সেই তুলনায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সীমিত আয়ের মধ্যে পরিবার পরিচালনা করতে গিয়ে কর্মচারীদের প্রতিদিন লড়াই করতে হচ্ছে ঋণ, অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপের সঙ্গে। এই পরিস্থিতি কোনো কল্যাণরাষ্ট্রের আদর্শের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
দীর্ঘদিন ধরে নবম পে-স্কেল নিয়ে আলোচনা, আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি শোনা গেলেও বাস্তব অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। এই দীর্ঘসূত্রিতা কেবল প্রশাসনিক বিলম্ব নয়; এটি কর্মচারীদের আত্মসম্মান ও মর্যাদার ওপর আঘাত হানছে। রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর। কর্মচারীরা যখন রাষ্ট্রের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন, তখন প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা দুর্বল হয়ে পড়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।
ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা উভয়ই বলে—শক্তিশালী ও কার্যকর রাষ্ট্র গড়ে ওঠে সন্তুষ্ট কর্মচারীর হাত ধরেই। ন্যায্য ও সময়োপযোগী বেতন কাঠামো কর্মস্পৃহা বাড়ায়, দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে এবং জনসেবার মান উন্নত করে। একই সঙ্গে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অবক্ষয়ের ঝুঁকিও কমে আসে। সে কারণে নবম পে-স্কেলকে ব্যয় হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি সংকীর্ণ ও আত্মঘাতী। এটি ব্যয় নয়; এটি মানবসম্পদে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ—যার সুফল শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রই ভোগ করে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কর্মচারীরা এখনো সংযম ও ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছেন। তারা ভাঙচুর বা সংঘাত নয়, সংলাপ ও সমাধান চান। তারা রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ নন; বরং রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড। কিন্তু ন্যায্য দাবি যদি বারবার উপেক্ষিত হয়, যদি গড়িমসি ও অনিশ্চয়তাই একমাত্র উত্তর হয়ে দাঁড়ায়, তবে জমে থাকা ক্ষোভ একসময় বিস্ফোরিত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সে ধরনের অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে তার দায় কর্মচারীদের নয়, বরং নীতিনির্ধারকদের ওপরই বর্তাবে।
একটি দায়িত্বশীল, জনবান্ধব ও ন্যায়ভিত্তিক সরকার তার কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি দীর্ঘদিন অবহেলা করতে পারে না। এখন প্রতিশ্রুতির সময় নয়; প্রয়োজন বাস্তব ও সাহসী সিদ্ধান্ত। অবিলম্বে নবম পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কর্মচারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
নবম পে-স্কেল কোনো অনুগ্রহ নয়—এটি অধিকার।
এই অধিকার নিশ্চিত করাই হবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের পথে সবচেয়ে জরুরি ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
প্রকাশক : শহিদুল ইসলাম
সম্পাদক : এম,এস,এ রেজা
প্রকাশক : 01746808322
সম্পাদক : 01712340047
ইমেইল : dailyajkersongram@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক আজকের সংগ্রাম. All rights reserved.