
বাবলু শেখ রাজবাড়ীঃ
সরকারি অফিসের সময়সূচি অনুযায়ী ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর ৩ টা। সাধারণ মানুষের সেবায় মুখর থাকার কথা থাকলেও রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ সাব-জোনাল পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের চিত্রটি ছিল ঠিক উল্টো। সারিবদ্ধ চেয়ারগুলো পড়ে আছে ফাঁকা, কম্পিউটারগুলো নিথর, আর পুরো অফিস জুড়ে বিরাজ করছে এক ভূতুড়ে নীরবতা। ৪৪ জন জনবল নিয়ে পরিচালিত এই অফিসে তখন পাওয়া গেল মাত্র একজন নারী কম্পিউটার অপারেটরকে। নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই কর্মকর্তাদের অফিস ত্যাগ এবং গ্রাহকদের সাথে চরম অসদাচরণের অভিযোগে এখন উত্তাল গোয়ালন্দ।
আসমা বেগমের আর্তনাদ: সেবা নয়, মিলল দুর্ব্যবহার!
ভুক্তভোগী গ্রাহক আসমা বেগমের অভিযোগ এই অফিসের সেবার মানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। ২০২৩ সালে একটি পিলারের জন্য আবেদন করে আজও দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তিনি। সম্প্রতি নিজের আবেদনের অগ্রগতি জানতে অফিসে গেলে তাকে পড়তে হয় তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখে। আসমা বেগম ক্ষোভের সাথে জানান, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তার সাথে অত্যন্ত রূঢ় আচরণ করেন। আবেদনপত্রের মেমো না থাকায় তাকে সোজাসুজি জানিয়ে দেওয়া হয়—তার ফাইল খুঁজে দেখা সম্ভব নয়।
পরবর্তীতে একজন কর্মচারী ফাইলটি খুঁজে পেলেও কোনো সমাধান মেলেনি। আসমা বেগম বলেন, আমি অনেক আশা নিয়ে এসেছিলাম, কিন্তু দুপুর ২ টার পর অফিসে গিয়ে দেখি সব চেয়ার ফাঁকা। যারা আছেন, তারাও মানুষের সাথে মানুষের মতো ব্যবহার করেন না। আমরা কি মানুষ নই?
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সরেজমিনে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিপরীতে অবস্থিত এই অফিসে গিয়ে দেখা যায় এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। অফিসের প্রবেশমুখেই কর্মকর্তাদের বসার স্থানগুলো জনশূন্য। শুধু কম্পিউটার অপারেটর শারমিন সুলতানা নিজের টেবিলে কাজ করছেন।
শারমিন সুলতানা জানান, বিকেল ৩টা ২০ মিনিটেও তিনি ছাড়া আর কোনো কর্মকর্তা সেখানে নেই। তার দেওয়া তথ্যমতে, ৪৪ জন স্টাফের মধ্যে নিয়মিত আছেন মাত্র ২৩ জন। এজিএম সকাল ৯টায় এসে দুপুর ২টার দিকেই অফিস ত্যাগ করেছেন। বাকিরা কোথায়? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, পুরুষ কর্মীরা ফিল্ডে থাকতে পারেন, তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য তার জানা নেই।
স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী জাহিদুল ইসলামও এই অফিসের অব্যবস্থাপনার শিকার। তিনি জানান, পেশাগত কাজে দুপুর ২:৩০ মিনিটে গিয়ে তিনি অফিস ফাঁকা পান। জাহিদুল ইসলাম বলেন, এটি একদিনের ঘটনা নয়, এটি এখানকার নিয়মিত চিত্র। এমনকি মিটার সংক্রান্ত সমস্যার কারণে আমাকে ১৫ দিন বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়েছে শুধু কর্মকর্তাদের অবহেলার কারণে। এখানে সেবা নিতে আসা মানেই হেনস্তার শিকার হওয়া।
কর্মকর্তাদের সাফাই:
অফিসে অনুপস্থিতির বিষয়ে কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে পাওয়া গেছে বিচিত্র সব অজুহাত!
সহকারী জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার প্রতাপ কুমার হালদার জানান, তিনি দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটে অফিস থেকে বের হয়ে ২টা ১৫ মিনিটে সদর দপ্তরে চলে গেছেন।
অন্যদের অনুপস্থিতির বিষয়ে তিনি দায় চাপিয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ওপর।
অন্যদিকে, অফিসের শীর্ষ কর্মকর্তা এজিএম মোঃ আসাদুজ্জামান জানান, তিনি নামাজের আগেই জরুরি কাজে রাজবাড়ী সদরে চলে গেছেন এবং সেদিন আর অফিসে ফেরার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। ফিল্ড ওয়ার্কের দোহাই দিয়ে তিনি বলেন, সবসময় অফিসে থাকা সম্ভব নয়। তবে গ্রাহক সেবা ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
এই অব্যবস্থাপনার বিষয়ে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও), সাথী দাস জানান, কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতির বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। দাপ্তরিক কাজে তারা বাইরে থাকতে পারেন, তবে বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
একটি সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে বিকেল ৪ টা পর্যন্ত কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও দুপুর ২ টার পর অফিস ফাঁকা হয়ে যাওয়াকে 'স্বেচ্ছাচারিতা' হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
যেখানে সাধারণ মানুষ একটি পিলারের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করে, সেখানে কর্মকর্তাদের এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতা জনমনে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে।
গোয়ালন্দবাসীর দাবি, পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের এই সেবাবিহীন জাঁকজমক বন্ধ হোক। তদন্তের মাধ্যমে দোষী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিয়ে গ্রাহক সেবার মান নিশ্চিত করা হোক।দাবি ভুক্তভোগী সহ এলাকাবাসীর
প্রকাশক : শহিদুল ইসলাম
সম্পাদক : এম,এস,এ রেজা
প্রকাশক : 01746808322
সম্পাদক : 01712340047
ইমেইল : dailyajkersongram@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক আজকের সংগ্রাম. All rights reserved.