
ইকবাল হোসেন:
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। জাতীয় কবির স্মৃতিধন্য ত্রিশালের বুকে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি অঞ্চলের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, সংগ্রাম, প্রত্যাশা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক। ২০২৬ সালের ৩ জুন বিশ্ববিদ্যালয়টি তার ১৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করতে যাচ্ছে। এই উপলক্ষে ফিরে দেখা প্রয়োজন এর জন্ম, বিকাশ, অর্জন এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার পথচলা।
ত্রিশালে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ছিল দীর্ঘদিনের। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত এই জনপদকে উচ্চশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার দাবিতে স্থানীয় জনগণ, শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পায় যখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০০৫ সালের ১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ২৫ মে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টির উদ্বোধন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে ত্রিশালের জনগণের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। এলাকাবাসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে জমি দান করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে বর্তমান জাতীয় সংসদ সদস্য ডা. মাহবুবুর রহমান লিটনের নিরলস প্রচেষ্টা, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করেছিল বলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক স্বীকৃতি রয়েছে। তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব, শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি এবং সর্বস্তরের জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই জাতীয় কবির নামে দেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম সম্ভব হয়েছিল।
আইনগতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৬ সালের ৯ মে। তবে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৭ সালের ৩ জুন। যাত্রার শুরুতে মাত্র দুটি অনুষদ—কলা অনুষদ এবং বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদের অধীনে চারটি বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়। বিভাগগুলো হলো বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য, সংগীত এবং কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ । প্রথম ব্যাচে প্রায় ১৮৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের সূচনা করে।
সীমিত অবকাঠামো ও জনবল এবং স্বল্প সুযোগ-সুবিধা নিয়ে শুরু হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়টি আজ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬টি অনুষদের অধীনে ২৫টি বিভাগ পরিচালিত হচ্ছে। প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী এখানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। ৫৭ একর জমির ওপর বিস্তৃত এই ক্যাম্পাসে প্রতিদিন জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের এক প্রাণবন্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদসমূহ হলো—কলা অনুষদ, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদ, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, চারুকলা অনুষদ এবং আইন অনুষদ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন বিভাগ, নতুন অবকাঠামো এবং নতুন একাডেমিক কার্যক্রম যুক্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির পরিধি ও গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।এছাড়াও নজরুল গবেষণার জন্য "নজরুল ইন্সটিটিউট' প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
প্রায় গত দুই দশকে বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষা, গবেষণা, সাহিত্য, সংগীত, নাটক, সংস্কৃতি এবং ক্রীড়াক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। বিশেষ করে নজরুলচর্চা, বাঙালি সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সাফল্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদাকে আরও উজ্জ্বল করেছে। তবে অর্জনের পাশাপাশি কিছু অপূর্ণতাও রয়ে গেছে। যে স্বপ্ন নিয়ে ত্রিশালের মানুষ একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক ও গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, সেই স্বপ্ন এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা তহবিল, উন্নত গ্রন্থাগার, পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার আরও সম্প্রসারণ প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়কে সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্রে পরিণত করতে হলে এসব বিষয়ে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে ত্রিশালের অর্থনীতি ও সমাজজীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, আবাসন, পরিবহন, কর্মসংস্থান এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রসার ঘটেছে। তবুও ত্রিশালকে একটি পরিকল্পিত শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন ছিল, তা এখনো পূর্ণতা পায়নি। সম্প্রতি ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’র ঘোষনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ত্রিশাল শিক্ষা, সংস্কৃতি, গবেষণা এবং পর্যটনের একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।
বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আধুনিক, গবেষণামুখী এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য ডা. মাহবুবুর রহমান লিটনের সক্রিয় সম্পৃক্ততা ত্রিশালবাসীর মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, পরিকল্পনা এবং অপূর্ণ স্বপ্ন বাস্তবায়নে বর্তমান প্রশাসন কার্যকর ভূমিকা রাখবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয় জনগণের।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্য, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও বিদ্রোহী চেতনার আদর্শ ধারণ করেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম। আগামী দিনে আন্তর্জাতিক মানের নজরুল গবেষণা কেন্দ্র, বৈশ্বিক নজরুল স্টাডিজ নেটওয়ার্ক এবং গবেষণাভিত্তিক জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে—যদি সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
১৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে প্রতিষ্ঠাতাদের স্বপ্ন, এলাকাবাসীর ত্যাগ এবং শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশাকে স্মরণ করার সময় এসেছে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, স্থানীয় জনগণ এবং সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের শিক্ষা ও গবেষণার এক অনন্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে।
ত্রিশালের বুকে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়; এটি একটি স্বপ্নের নাম। সেই স্বপ্নের ১৯ বছরের পথচলা আজ আমাদের গর্বিত করে, অনুপ্রাণিত করে এবং ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর অর্জনের প্রত্যাশা জাগিয়ে তোলে।
প্রকাশক : শহিদুল ইসলাম
সম্পাদক : এম,এস,এ রেজা
প্রকাশক : 01746808322
সম্পাদক : 01712340047
ইমেইল : dailyajkersongram@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক আজকের সংগ্রাম. All rights reserved.