
হাঁটুসমান কাদা মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা, কৃষিপণ্য পরিবহনে বিপর্যয়; দ্রুত সংস্কারের দাবি এলাকাবাসীর
শাহেদ আহমেদ, সাতক্ষীরা:
বর্ষার বৃষ্টিতে সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের প্রতাপনগর-রুইয়ারবিল-শুভাদ্রকাঠি-চাকলা সড়কের বেহাল অবস্থা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য বড় বড় খানাখন্দ। বর্ষার পানিতে সেগুলো কাদা ও জলাবদ্ধতায় পরিণত হওয়ায় সড়কটি এখন প্রায় চলাচলের অনুপযোগী। প্রতিদিন জুতা হাতে নিয়ে খালি পায়ে হাঁটুসমান কাদা মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, রোগী ও সাধারণ পথচারীসহ কয়েকটি গ্রামের হাজারো মানুষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতাপনগর ইউনিয়নের প্রতাপনগর বাজার থেকে রুইয়ারবিল, শুভাদ্রকাঠি হয়ে চাকলা পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি এলাকার মানুষের অন্যতম প্রধান যোগাযোগমাধ্যম। প্রতিদিন এই সড়ক ব্যবহার করে শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যাতায়াত করেন। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে সড়কটির স্থায়ী সংস্কার না হওয়ায় বছরের পর বছর এটি অবহেলিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। স্থানীয়ভাবে কোথাও কোথাও সামান্য মাটি ফেলা হলেও তা বর্ষার পানিতে দ্রুত ধুয়ে যায়। ফলে প্রতিবছর বর্ষা এলেই দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
বর্তমানে সড়কের অধিকাংশ অংশ কাদা ও পানিতে ডুবে রয়েছে। কোথাও কোথাও হাঁটুসমান কাদা জমে থাকায় পথচারীদের চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মোটরসাইকেল, ভ্যান, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন যানবাহন প্রায়ই কাদায় আটকে যাচ্ছে। অনেক সময় চালকদের ধাক্কা দিয়ে গাড়ি পার করতে হচ্ছে। প্রতিদিন ছোট-বড় দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী এই সড়ক ব্যবহার করে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় যাতায়াত করে। অনেককে জুতা হাতে নিয়ে খালি পায়ে কাদা মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যেতে দেখা যায়। বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর আগেই তাদের পোশাক কাদায় নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় পিছলে পড়ে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক অভিভাবক সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। এতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও লেখাপড়ায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে অভিভাবকদের অভিযোগ।
কৃষকদের দুর্ভোগও কম নয়। এলাকার প্রধান জীবিকা কৃষিনির্ভর হওয়ায় ধান, পাট, শাকসবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বাজারে নিতে এই সড়কের ওপরই নির্ভর করতে হয়। কিন্তু সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেছে এবং অনেক সময় সময়মতো কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে কৃষকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। ব্যবসায়ীরাও পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত খরচ ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
জরুরি রোগী পরিবহনেও সৃষ্টি হয়েছে চরম সংকট। অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্স বা অন্যান্য যানবাহন সহজে চলাচল করতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে কাদা মাড়িয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো সড়ক পর্যন্ত নিয়ে যেতে হয়। স্থানীয়দের মতে, জরুরি মুহূর্তে এ ধরনের পরিস্থিতি জীবনঝুঁকিও তৈরি করছে।
সড়কটির করুণ চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে দ্রুত সংস্কারের দাবি জানানো হলেও এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দা আলফাজ হোসেন বলেন, “বছরের পর বছর ধরে এই সড়কটি সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছি। বর্ষা এলেই দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ছোট ছোট শিশুদের জুতা হাতে নিয়ে কাদার মধ্যে হেঁটে স্কুলে যেতে দেখে খুব কষ্ট লাগে। জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের একটাই দাবি—অতি দ্রুত সড়কটি সংস্কার করা হোক।”
আরেক বাসিন্দা জানান, “একজন রোগী বা গর্ভবতী নারীকে হাসপাতালে নিতে হলে কী দুর্ভোগ পোহাতে হয়, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কটি কাদার সাগরে পরিণত হয়।”
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী মাওলানা রিয়াছাত আলী বলেন, “এই সড়কটি প্রতাপনগর ইউনিয়নের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের প্রতীক। জনগণের সেবা করার সুযোগ পেলে সড়কটির সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি স্থায়ী সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।”
প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ আবু দাউদ বলেন, “এটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন সড়ক। এর বেহাল অবস্থার বিষয়টি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। অনুমতিও পাওয়া গেছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু করার চেষ্টা করা হবে।”
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী অনিন্দ্য দেব সরকারের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন ও দাবি জানানো হলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে। তাদের মতে, একটি নিরাপদ ও টেকসই সড়ক শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই দ্রুত বরাদ্দ নিশ্চিত করে আধুনিক ও টেকসইভাবে সড়কটি সংস্কার করা এখন সময়ের দাবি।
স্থানীয়দের আশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিলে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হবে, কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবেন প্রতাপনগর ইউনিয়নের হাজারো মানুষ।
প্রকাশক : শহিদুল ইসলাম
সম্পাদক : এম,এস,এ রেজা
প্রকাশক : 01746808322
সম্পাদক : 01712340047
ইমেইল : dailyajkersongram@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক আজকের সংগ্রাম. All rights reserved.