
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি :
সীমান্তঘেঁষা জেলা ঠাকুরগাঁও বহু বছর ধরেই মাদক চোরাচালানের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ করিডোর হিসেবে পরিচিত। ভারতের সঙ্গে বিস্তৃত সীমান্তকে ব্যবহার করে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা, ট্যাপেন্টাডল, ডেক্সামেথাসনসহ বিভিন্ন মাদক জেলায় প্রবেশ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার এবং অসংখ্য কারবারি গ্রেপ্তার হলেও প্রশ্ন উঠছে—বারবার ধরা পড়ছে মাঠপর্যায়ের কারবারিরা, কিন্তু মাদক সিন্ডিকেটের মূল নিয়ন্ত্রক, অর্থদাতা এবং সীমান্তভিত্তিক নেটওয়ার্কের শীর্ষ ব্যক্তিরা কেন এখনও অধরাই রয়ে যাচ্ছেন?
এই বাস্তবতার মধ্যেই স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, "শুধু আইন প্রয়োগ কিংবা শাস্তির মাধ্যমে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করে মাদকের বিরুদ্ধে শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।"
মঙ্গলবার ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও প্রচারণা কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, অভিযান চলবে, তবে তার সঙ্গে জনসচেতনতা, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাই হবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। অভিযানে সাফল্যে মাঝে প্রশ্ন বাড়ছে অনেক।
জুলাইজুড়ে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), থানা পুলিশ, র্যাব-১৩, বিজিবি এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) একাধিক অভিযান পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে কয়েক হাজার পিস ইয়াবা, ৬৪ কেজির বেশি গাঁজা, শত শত বোতল ফেনসিডিল, বিপুল পরিমাণ ট্যাপেন্টাডল ও অন্যান্য মাদক উদ্ধার হয়েছে।
হরিপুর সীমান্তে বিজিবির অভিযানে দুইজনকে আটক করে ১০ বোতল ফেনসিডিল, ২৪০ পিস প্যারোপটিন ট্যাবলেট এবং একটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়। বালিয়াডাঙ্গীতে ডিবি পুলিশের অভিযানে ৫৯০ পিস ইয়াবাসহ দুই চিহ্নিত কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়। সদর উপজেলার পূর্ব পারপুগী এলাকায় র্যাব-১৩-এর অভিযানে একটি বাড়ি থেকে ৩৫৩ বোতল বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধার এবং এক দম্পতিকে আটক করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সীমান্তকেন্দ্রিক নেটওয়ার্কে আঘাত হানার চেষ্টা চলছে। সীমান্ত রুট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেলার সাতটি থানার মধ্যে পাঁচটিই ভারতীয় সীমান্তসংলগ্ন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, অধিকাংশ মাদক সীমান্ত পেরিয়ে প্রথমে সীমান্তবর্তী এলাকায় মজুদ করা হয়। পরে জেলা শহর হয়ে বিভিন্ন পরিবহন ব্যবস্থায় দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পাঠানো হয়।
পুলিশের নজরদারিতে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে রয়েছে প্রেসক্লাব-সংলগ্ন এলাকা, মুন্সিপাড়া, আটগ্যালারী, গোবিন্দনগরসহ কয়েকটি স্থান। এসব এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হলেও মাদক সরবরাহের বিকল্প রুট ব্যবহার করছে সংঘবদ্ধ চক্র। মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সাম্প্রতিক অভিযানে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের অধিকাংশই মাঠপর্যায়ের পরিবহনকারী, খুচরা বিক্রেতা বা স্থানীয় সহযোগী। স্থানীয়দের অভিযোগ, যারা সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ করায়, অর্থায়ন করে এবং জেলার ভেতরে বড় নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা তুলনামূলক কম।
এ ছাড়া কিছু এলাকায় রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে মাদক কারবারিদের রক্ষা করার অভিযোগও স্থানীয়ভাবে শোনা যায়। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেনি এবং অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ।
বিশ্লেষকদের মতে, কেবল উদ্ধার ও গ্রেপ্তারের পরিসংখ্যান দিয়ে মাদক পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র মূল্যায়ন করা যায় না। বড় সিন্ডিকেটের আর্থিক প্রবাহ, সীমান্তসংযোগ, অর্থপাচার এবং স্থানীয় সহযোগী নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতির পরিবর্তন কঠিন হবে।
মন্ত্রীর বার্তা: সামাজিক আন্দোলনই মূল শক্তি
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, "আমরা মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করেছি। আমাদের লক্ষ্য এটিকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা। শিক্ষক, অভিভাবক, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং গণমাধ্যমকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।"
তিনি বলেন, তরুণদের মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করতে না পারলে শুধু আইন প্রয়োগ করে সফল হওয়া সম্ভব নয়। পরিবার থেকেই প্রতিরোধ শুরু করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ ও তাদের ধারণা,
মাদকবিরোধী কার্যক্রম নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টদের মতে, সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চাহিদা কমানোর দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। স্কুল-কলেজভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি, কিশোর-তরুণদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে আন্তঃজেলা ও আন্তঃসংস্থার গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান আরও কার্যকর করা গেলে বড় সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযান অধিক ফলপ্রসূ হতে পারে বলে মনে করছেন তারা। সামনে আমাদের জন্য যে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী 'জিরো টলারেন্স' নীতিতে অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। তবে বাস্তবতা বলছে, শুধু গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়লেই মাদক নির্মূল হবে না। সীমান্ত চোরাচালান বন্ধ, মূল হোতাদের বিচারের আওতায় আনা, অর্থের উৎস বন্ধ করা এবং সমাজজুড়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য আসবে না।
ঠাকুরগাঁও এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রশাসনের কঠোর অভিযান এবং সামাজিক আন্দোলন—দুইয়ের কার্যকর সমন্বয়ই নির্ধারণ করবে জেলার ভবিষ্যৎ মাদক পরিস্থিতি।
প্রকাশক : শহিদুল ইসলাম
সম্পাদক : এম,এস,এ রেজা
প্রকাশক : 01746808322
সম্পাদক : 01712340047
ইমেইল : dailyajkersongram@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক আজকের সংগ্রাম. All rights reserved.