
শাহেদ আহমেদ সাতক্ষীরা
সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় নীলা খাতুন (১৬) নামের এক কলেজছাত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, কলেজে যাওয়া-আসার পথে স্থানীয় কয়েকজন যুবক দীর্ঘদিন ধরে নীলাকে উত্ত্যক্ত ও কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। এর প্রতিবাদ করায় তাঁর বাবা ও পরিবারের সদস্যদের হুমকি ও মারধর করা হয়। এসব ঘটনার কয়েক দিনের মাথায় সোমবার (৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় নিজ বাড়ির একটি কক্ষ থেকে নীলার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের দাবি, তাঁকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখা হয়ে থাকতে পারে। আবার যদি এটি আত্মহত্যা হয়ে থাকে, তাহলে দীর্ঘদিনের উত্ত্যক্ত, অপমান ও নির্যাতনের কারণে তিনি আত্মহত্যায় প্ররোচিত হয়ে থাকতে পারেন। তবে নীলার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। পুলিশ বলছে, তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
নীলা ধুলন্ডা গ্রামের লিটন শেখের মেয়ে এবং স্থানীয় মাগুরা আইডিয়াল কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। গত সোমবার সন্ধ্যায় বাড়ির একটি কক্ষে তাঁকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান স্বজনেরা। তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিকেলে পারিবারিক কবরস্থানে নীলার দাফন সম্পন্ন হয়।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, কলেজে যাওয়া-আসার পথে কয়েকজন যুবক দীর্ঘদিন ধরে নীলাকে উত্ত্যক্ত করতেন। তাঁকে কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বিষয়টি পরিবারকে জানানোর পর নীলার বাবা লিটন শেখ একই গ্রামের আমজেত শেখের কাছে গিয়ে অভিযোগ করেন। তাঁর পরিবারের যুবকদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখার অনুরোধ করেন তিনি। পরিবারের অভিযোগ, এ ঘটনার পর অভিযুক্তরা লিটন শেখের পরিবারের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং তাঁদের সঙ্গে বিরোধ তীব্র হয়।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত ১ অক্টোবর রাতে অভিযুক্তরা সংঘবদ্ধ হয়ে লিটন শেখের বাড়িতে গিয়ে নীলা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেন। পরদিন ২ অক্টোবর জেঠুয়া বাজারে লিটন শেখের খাবারের হোটেলে গিয়ে নীলাকে নিয়ে কুৎসা ও অপপ্রচার চালানোর অভিযোগও করা হয়েছে। এজাহার অনুযায়ী, একই দিন দুপুরে বাড়ি ফেরার পথে লিটন শেখকে অভিযুক্তরা ঘিরে ধরে মারধর করেন। খবর পেয়ে নীলা ও তাঁর মা তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে তাঁদের ওপরও হামলা করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এর কয়েক দিনের মধ্যেই নীলার মৃত্যু হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, সোমবার সন্ধ্যায় বাড়ির একটি কক্ষ থেকে তাঁকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান তাঁরা। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও বাঁচানো যায়নি। মেয়েকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন বাবা লিটন শেখ। তাঁর অভিযোগ, নীলাকে নিয়মিত উত্ত্যক্ত করা হতো। প্রতিবাদ করায় অভিযুক্তরা তাঁদের বাড়িতে গিয়ে হুমকি দিয়েছেন, বাজারে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়েছেন এবং পরিবারের সদস্যদের মারধর করেছেন। লিটন শেখ বলেন, তাঁর মেয়েকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখা হয়ে থাকতে পারে। আবার চরম অপমান ও নির্যাতনের কারণে নীলা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়ে থাকলেও এর পেছনে কারও প্ররোচনা ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা দরকার। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
ঘটনার পর সোমবার রাতে নীলার বাবা লিটন শেখ বাদী হয়ে তালা থানায় মামলা করেন। হত্যা ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে করা মামলাটির নম্বর ০৪। মামলায় ধুলন্ডা গ্রামের আমজেত শেখ (৫০), রকি শেখ (২৪), সৈয়েব মালি (১৮), ইমন শেখ (২২), ইমরান শেখ (২৮), আকলিমা বেগম (২৫) ও আকবর শেখকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
তালা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক বলেন, নিহতের বাবা সাতজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছিল। ঘটনার পর থেকে মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা পলাতক রয়েছেন। তাঁদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে বলে জানান তিনি।
নীলার মৃত্যুর ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সাতক্ষীরার মানবাধিকারকর্মী মাধব দত্ত। তিনি বলেন, নীলাকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ, পরিবারের ওপর হামলা ও হুমকির অভিযোগ এবং মৃত্যুর আগের কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ—সবকিছুই তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। নীলার মৃত্যু পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, নাকি কোনো ধরনের চাপ, অপমান বা নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা—তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া দরকার। একই সঙ্গে ঘটনায় প্রকৃতপক্ষে যারা জড়িত, তদন্তে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
নীলার মৃত্যুর ঘটনায় এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। পরিবারের অভিযোগ ও মামলার এজাহারে নানা দাবি থাকলেও সেগুলো তদন্তে এখনো প্রমাণিত হয়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং মামলার তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারিত হবে। তবে কলেজে যাওয়া-আসার পথে এক কিশোরীকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ থেকে শুরু করে পরিবারের ওপর হামলা-হুমকি এবং এর কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নীলার পরিবার এখন শুধু মেয়েকে হারানোর শোকই নয়, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানার অপেক্ষাতেও রয়েছে।
প্রকাশক : শহিদুল ইসলাম
সম্পাদক : এম,এস,এ রেজা
প্রকাশক : 01746808322
সম্পাদক : 01712340047
ইমেইল : dailyajkersongram@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক আজকের সংগ্রাম. All rights reserved.