
গোলমুন্ডায় সাবগ্রেডে কাদামাটি, সাব-বেজে নিম্নমানের ইট—নির্মাণমান ও এলজিইডির তদারকি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন
বিশেষ প্রতিনিধি:
নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার গোলমুন্ডা ইউনিয়নে ফুটবল মাঠ থেকে নাড্ডাপাড়া পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার নদীরক্ষা বাঁধের রাস্তা সংস্কার ও উন্নয়নকাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ২ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয়ে চলমান এই প্রকল্পে নির্ধারিত নির্মাণসামগ্রী ও কাজের পদ্ধতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিন পরিদর্শনে সড়কের বিভিন্ন অংশে নির্মাণকাজের উপকরণ ও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাস্তার সাবগ্রেড প্রস্তুতের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মানসম্পন্ন ভিটি বালুর পরিবর্তে কাদামাটি ও মাটি জাতীয় উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে। এরপর সাব-বেজে যে পরিমাণ ও মানের ইটের খোয়া ব্যবহারের কথা, বাস্তবে তার পরিবর্তে নিম্নমানের ইটের খোয়া ও অতিরিক্ত বালু ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
৫০:৫০-এর বদলে ৯০:১০ ব্যবহারের অভিযোগ
স্থানীয়দের দাবি, নির্ধারিত মিশ্রণ অনুযায়ী যেখানে বালু ও ইটের খোয়া যথাযথ অনুপাতে ব্যবহারের কথা, সেখানে বাস্তবে প্রায় ৯০ শতাংশ বালু ও ১০ শতাংশ ইটের খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে রাস্তার ভারবহন ক্ষমতা, স্থায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়—সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রথমে ট্রাক্টরযোগে মাটি এনে রাস্তার ওপর ফেলা হচ্ছে। পরে তার ওপর অল্প পরিমাণ বালু ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এরপর ইটের খোয়া ও বালু ব্যবহার করে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—প্রকল্পের অনুমোদিত নকশা, স্পেসিফিকেশন ও প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি না, তা কি নিয়মিতভাবে পরিমাপ ও যাচাই করা হচ্ছে?
নদীরক্ষা বাঁধের ওপর রাস্তা—ঝুঁকি আরও বেশি
এটি সাধারণ কোনো গ্রামীণ রাস্তা নয়; নদীরক্ষা বাঁধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সড়ক হওয়ায় নির্মাণকাজে মাটির স্তর, সাবগ্রেড, সাব-বেজ, কমপ্যাকশন ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তাদের আশঙ্কা, বাঁধের নিচে ও আশপাশে প্রচুর বালু থাকার কারণে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে রাস্তা নির্মাণ করা হলে ভারী যানবাহনের চাপ, বৃষ্টির পানি কিংবা নদীর পানির প্রভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই রাস্তার বিভিন্ন অংশ দেবে যাওয়া, ফাটল সৃষ্টি কিংবা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অভিযোগের পরও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেই
রাস্তার কাজের মান নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন পোস্ট ও মন্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে। তারপরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় উপজেলা এলজিইডির তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
তাদের অভিযোগ, সরকারি অর্থে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর কাজ চলাকালে প্রকৌশলীদের নিয়মিত মাঠপর্যায়ের তদারকি, উপকরণের মান যাচাই এবং কাজের প্রতিটি ধাপ পরিমাপের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে এসব কতটা হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
‘টাকার খেলা’র অভিযোগ, তদন্তের দাবি
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, বিভিন্ন স্তরে দালাল, মধ্যস্বত্বভোগী কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তৎপরতার কারণে প্রকল্পের কাজের প্রকৃত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের স্বপক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসীর দাবি, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে দ্রুত প্রকল্পের কার্যাদেশ, প্রাক্কলন, বিল-ভাউচার, নির্মাণসামগ্রীর মান, ব্যবহৃত উপকরণের অনুপাত, কাজের পরিমাপ এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব অগ্রগতি পরীক্ষা করা হোক।
তাদের মতে, শুধু কাগজে-কলমে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল পরিশোধ করা হলে ভবিষ্যতে সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে নিম্নমানের সড়কের ভোগান্তি বহন করতে হতে পারে।
দ্রুত কারিগরি তদন্তের দাবি
স্থানীয়রা সড়কটির কাজ বন্ধ করে নয়, বরং প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা ও মান যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা নির্ণয়ের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
তারা আরও বলেন, দ্রুত জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের প্রকৌশল কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে সরেজমিন তদন্ত না হলে বিষয়টি নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে যাওয়ার কথাও ভাবছেন এলাকাবাসী।
অভিযোগের বিষয়ে জলঢাকা উপজেলা এলজিইডির উপ-বিভাগীয় কর্মকর্তা আব্দুর রহিম রতনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “অনিয়ম, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। এরকম হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এখন দেখার বিষয়—২ কোটি ৯১ লাখ টাকার এই প্রকল্পে বাস্তবে কোন মানের উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে, অনুমোদিত স্পেসিফিকেশন কতটা অনুসরণ করা হচ্ছে এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে কাজের মান যাচাই করছেন কি না।
এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে কি নিরপেক্ষ কারিগরি তদন্তে, নাকি অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে প্রকল্পের নির্মাণমান নিয়ে বিতর্ক—সেদিকেই এখন নজর এলাকাবাসীর।
প্রকাশক : শহিদুল ইসলাম
সম্পাদক : এম,এস,এ রেজা
প্রকাশক : 01746808322
সম্পাদক : 01712340047
ইমেইল : dailyajkersongram@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক আজকের সংগ্রাম. All rights reserved.