
শাহেদ আহমেদ সাতক্ষীরা:
সাতক্ষীরার কালীগঞ্জে যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী সাবিনা ইসলাম ও শিশুকন্যা আয়েশা সিদ্দিকাকে হত্যার দায়ে স্বামী আব্দুর রউফ সরদারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) সাতক্ষীরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. জাকারিয়া হোসেন এ রায় ঘোষণা করেন। মামলার তথ্য অনুযায়ী, দণ্ডপ্রাপ্ত আব্দুর রউফ সরদার জামিনে মুক্ত হওয়ার পর থেকে পলাতক রয়েছেন। দণ্ডপ্রাপ্ত আব্দুর রউফ সরদার কালীগঞ্জ উপজেলার ঘোনা গ্রামের আব্দুল্লাহ সরদারের ছেলে। এ মামলার বাদী নিহত সাবিনা ইসলামের মা জাহানারা খাতুন (৫৬)। তিনি একই উপজেলার তারালি সরদার পাড়ার বাসিন্দা। যৌতুকের দাবিতে সংসারে অশান্তি মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, জাহানারা খাতুনের মেয়ে সাবিনা ইসলাম (২৬) কালীগঞ্জ উপজেলার ঘোনা গ্রামের আব্দুর রউফ সরদারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর তাঁদের সংসারে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। তবে দাম্পত্য জীবনের একপর্যায়ে যৌতুকের দাবিকে কেন্দ্র করে তাঁদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। এ নিয়ে পারিবারিক অশান্তি বাড়তে থাকে বলে অভিযোগ করেন বাদী। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, আসামির মায়ের চিকিৎসার খরচের জন্য ৫০ হাজার টাকা এবং মোটরসাইকেল কেনার জন্য অর্থ দাবি করা হয়। এসব দাবি নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতির অবনতি হলে সাবিনা ইসলাম তাঁর শিশুকন্যাকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে আসেন। রাতের আঁধারে প্রাণ হারান মা ও মেয়ে মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর রাতে পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে ছিলেন। এ সময় সাইকেলের শব্দ শুনে ঘুম থেকে জেগে ওঠেন সাবিনার মা জাহানারা খাতুন। পরে তিনি ঘরের ভেতরে গিয়ে মেয়ে সাবিনা ইসলাম ও নাতনি আয়েশা সিদ্দিকাকে খাটের ওপর নিথর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। মেয়ে ও নাতনির এমন অবস্থা দেখে তিনি তাঁদের বাঁচানোর চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁদের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে। মা ও শিশুকন্যার মৃত্যুর ঘটনায় বিচার চেয়ে থানায় অভিযোগ দায়ের করেন জাহানারা খাতুন। তদন্ত শেষে শুরু হয় বিচারিক কার্যক্রম ঘটনার পর পুলিশ মামলাটি তদন্ত করে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালতে চিকিৎসক, তদন্ত কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেটসহ মোট ১২ জন সাক্ষ্য দেন। এ ছাড়া মামলার নথিতে আসামির ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দির বিষয়টিও উল্লেখ রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে সাক্ষীদের বক্তব্য, চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য, তদন্তের বিবরণ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি উপস্থাপন করে। দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আদালত আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেন। মৃত্যুদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বিচারিক কার্যক্রম শেষে আদালত আব্দুর রউফ সরদারকে স্ত্রী সাবিনা ইসলাম ও শিশুকন্যা আয়েশা সিদ্দিকাকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। একই সঙ্গে তাঁকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলা এ মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে বিচারিক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় শেষ হলো। তবে মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামি জামিনে মুক্ত হওয়ার পর থেকে পলাতক রয়েছেন। ফলে তাঁকে গ্রেপ্তার করে আদালতের রায় কার্যকরের বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। রায়ে সন্তুষ্ট রাষ্ট্রপক্ষ রায় ঘোষণার পর সাতক্ষীরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট আলমগীর আরশাফ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে চিকিৎসক, তদন্ত কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেটসহ মোট ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য এবং আসামির ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিসহ প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেছে। পিপি বলেন, দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে আসামির অপরাধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এবং তাঁকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানার আদেশ দিয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষ এ রায়ে সন্তুষ্ট। তিনি আরও বলেন, যৌতুকের দাবিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে রায়টি কঠোর বার্তা হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে জামিনে মুক্ত হয়ে পলাতক থাকা আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে আদালতের রায় কার্যকরের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
প্রকাশক : শহিদুল ইসলাম
সম্পাদক : এম,এস,এ রেজা
প্রকাশক : 01746808322
সম্পাদক : 01712340047
ইমেইল : dailyajkersongram@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক আজকের সংগ্রাম. All rights reserved.