
সুমন খান:
বরিশালের উজিরপুর উপজেলার হারতা এলাকায় মাদক কারবারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াকে কেন্দ্র করে এক পুলিশ কর্মকর্তার বাড়ির ছয়টি সিসি ক্যামেরা চুরির অভিযোগ ঘিরে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় দায়ের করা এজাহারে জাহিদ বালী (২০), জাকির বালী (৪৮) এবং অজ্ঞাতনামা আরও তিন থেকে চারজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগকারী বাংলাদেশ পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) জিয়াউর রহমান বর্তমানে ঢাকা জেলার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় কর্মরত।অভিযোগকারী পক্ষের সর্বশেষ দাবি, এ ঘটনায় অভিযুক্ত জাহিদ বালীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে জাকির বালী এখনো পলাতক রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত ১০টি মামলার তথ্য রয়েছে বলেও অভিযোগকারী পক্ষ দাবি করেছে। যদিও এসব মামলার নম্বর, বর্তমান অবস্থা এবং গ্রেপ্তারের তথ্য সংশ্লিষ্ট থানা ও আদালতের নথি থেকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।ঘটনাটি শুধু ছয়টি সিসি ক্যামেরা চুরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ কি না, নাকি এর পেছনে মাদক কারবারের বিরোধ, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে—তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।মাদক কারবারের বিরুদ্ধে অবস্থান, এরপরই ক্যামেরা চুরির অভিযোগ,এজাহার সূত্রে জানা যায়, হারতা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে এসআই জিয়াউর রহমানের মালিকানাধীন একটি একতলা ভবন রয়েছে। ভবনের নিরাপত্তার জন্য চারপাশে HIKVISION ব্র্যান্ডের ছয়টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছিল।অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২০ অক্টোবর রাত ১০টা থেকে ২১ অক্টোবর ভোর ৪টার মধ্যে কোনো একসময় ভবন থেকে ক্যামেরাগুলো চুরি করা হয়। পরদিন সকালে বাড়ির ম্যানেজার সুমিত বরালের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারেন বাড়ির মালিক।চুরি হওয়া ক্যামেরাগুলোর আনুমানিক মূল্য ২৪ হাজার টাকা বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।অভিযোগকারী জিয়াউর রহমানের দাবি, বাড়ির আশপাশে মাদকদ্রব্য বিক্রির কর্মকাণ্ড চলার বিষয়টি তাঁর নজরে আসে। নিরাপত্তার জন্য ক্যামেরা স্থাপনের পর ক্যামেরার ফুটেজে কয়েকজনকে দেখতে পেয়ে তাঁদের ওই পথ ব্যবহার না করার বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি। এরপর থেকেই বিরোধের সূত্রপাত বলে তাঁর অভিযোগ।তাঁর আশঙ্কা, মাদক কারবারের কর্মকাণ্ড আড়াল করা কিংবা বাড়ির নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল করার উদ্দেশ্যে ক্যামেরাগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে চুরির সঙ্গে মাদক কারবারের বিরোধের সরাসরি যোগসূত্র এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।জাকির বালীকে ঘিরে পুরোনো মাদক মামলার তথ্য, নতুন করে আলোচনায়,জাকির বালীকে নিয়ে অনুসন্ধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরোনো সংবাদ পাওয়া গেছে। এনটিভি অনলাইনে ২০২২ সালের ১৭ মার্চ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বরিশালের উজিরপুরের হারতা এলাকায় র্যাবের অভিযানে জাকির হোসেন বালী (৪৫) ও সমীর হালদারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁদের কাছ থেকে ১ কেজি ৪০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারের কথা জানায় র্যাব-৮। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়েরের তথ্যও প্রকাশিত হয়।পুরোনো প্রতিবেদনে উল্লেখিত জাকির হোসেন বালী এবং বর্তমান অভিযোগে নাম থাকা জাকির বালী একই ব্যক্তি কি না, তা জাতীয় পরিচয়পত্র, পিতার নাম, ঠিকানা ও মামলার নথি মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। তবে একই নাম, এলাকা ও বয়সের সামঞ্জস্যের কারণে বিষয়টি অনুসন্ধানের দাবি রাখে।অন্যদিকে, জাকির বালীর বিরুদ্ধে ১০টি মামলা থাকার যে দাবি উঠেছে, সেগুলোর মধ্যে কতটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলা, কতটি বিচারাধীন এবং কোনো মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে কি না—তা খতিয়ে দেখা জরুরি।জাহিদ গ্রেপ্তার, জাকির কোথায়।অভিযোগকারী পক্ষের দাবি অনুযায়ী, ক্যামেরা চুরির ঘটনায় অভিযুক্ত জাহিদ বালীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে তাঁর গ্রেপ্তারের তারিখ, কোন মামলায় গ্রেপ্তার এবং আদালতে সোপর্দের বিষয়টি পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও আদালতের নথি দিয়ে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।অন্যদিকে, জাকির বালীকে এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগকারী পক্ষ দাবি করেছে। তিনি কোথায় অবস্থান করছেন, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে কি না এবং অন্য কোনো মামলায় তিনি জামিনে রয়েছেন কি না, সেসব তথ্যও যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয় পর্যায়ে মাদকদ্রব্যের সরবরাহ, বিক্রির সম্ভাব্য নেটওয়ার্ক এবং এর সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।শুধু ক্যামেরা চুরি নয়, মাদকের নেটওয়ার্কও তদন্তের দাবি,স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি অভিযোগকারী পক্ষের বক্তব্যে আরও কিছু গুরুতর বিষয় উঠে এসেছে। এলাকায় মাদক বিক্রি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, প্রতিবাদকারীদের হুমকি এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে কয়েকজনের বিরুদ্ধে।তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রয়োজন নির্দিষ্ট মামলা, জিডি, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ভুক্তভোগীদের তথ্য এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত প্রতিবেদন।
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের তদন্তে যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে মাদক কারবারের বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে সিসি ক্যামেরা চুরি করা হয়েছে, তাহলে বিষয়টি সাধারণ চুরির বাইরে অপরাধের আলামত নষ্ট করা কিংবা নিরাপত্তাব্যবস্থা অকার্যকর করার উদ্দেশ্যেও সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে ঘটনার পেছনের পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা শনাক্ত করা জরুরি।পুলিশের কাছে যেসব প্রশ্নের উত্তর চায় এলাকাবাসী,এসআই জিয়াউর রহমানের বাড়ির ছয়টি সিসি ক্যামেরা চুরির ঘটনায় তদন্ত কতদূর এগিয়েছে?জাহিদ বালী সত্যিই গ্রেপ্তার হয়েছেন কি না এবং তাঁর বিরুদ্ধে কী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? জাকির বালীর বিরুদ্ধে ১০টি মামলার অভিযোগের সত্যতা কতটুকু?২০২২ সালে গাঁজাসহ গ্রেপ্তার হওয়া জাকির হোসেন বালী এবং বর্তমান অভিযোগে অভিযুক্ত জাকির বালী একই ব্যক্তি কি না?হারতা এলাকায় মাদকদ্রব্যের সরবরাহ ও বিক্রির সঙ্গে আর কারা জড়িত।ক্যামেরা চুরির সঙ্গে মাদক কারবারের বিরোধের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না?স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রতিবাদকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের বিশেষ নজরদারি রয়েছে কি না?
নিরপেক্ষ তদন্ত ও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবি
একজন পুলিশ কর্মকর্তার বাড়ি থেকে নিরাপত্তার জন্য স্থাপিত ছয়টি সিসি ক্যামেরা চুরির অভিযোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি রাখে। একই সঙ্গে হারতা এলাকায় মাদকদ্রব্যের বিস্তার, কথিত অপরাধচক্রের কার্যক্রম এবং অভিযোগকারীর নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, উজিরপুর মডেল থানা পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে তদন্ত করে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি অভিযোগের বাইরে থাকা নির্দোষ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।এখন বড় প্রশ্ন ?হারতার মাদক কারবারের অভিযোগের পেছনে কারা, ক্যামেরা চুরির ঘটনায় প্রকৃত জড়িত কারা এবং কথিত অপরাধচক্রের নেপথ্যে আর কেউ রয়েছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে নিরপেক্ষ তদন্ত, মামলার নথি এবং পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মাধ্যমে।
প্রকাশক : শহিদুল ইসলাম
সম্পাদক : এম,এস,এ রেজা
প্রকাশক : 01746808322
সম্পাদক : 01712340047
ইমেইল : dailyajkersongram@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক আজকের সংগ্রাম. All rights reserved.