রিপোর্টার
বগুড়া জেলা প্রতিনিধি :
ওহাব সরকার
SMART প্রকল্পের সহায়তায় বদলে গেল সরকার মেটাল এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং
একসময় কারখানার আকাশে উড়ত কয়লার ধোঁয়া, ধাতু গলানোর কাজে ব্যবহার হতো প্রচলিত কয়লাচালিত কিউপোলা ফার্নেস। উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, কাঁচামালের অপচয় এবং পরিবেশদূষণ ছিল নিত্যদিনের চ্যালেঞ্জ। সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্রে এসেছে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন। কয়লাচালিত কিউপোলা ফার্নেসের পরিবর্তে আধুনিক ইনডাকশন ফার্নেস প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। উৎপাদন খরচ কমেছে, কাঁচামালের অপচয় হ্রাস পেয়েছে এবং কারখানার শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে একজন স্বপ্নবাজ উদ্যোক্তা মোঃ সিহাব উদ্দিন সরকার এবং SMART প্রকল্পের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা।
বগুড়ার ফুলবাড়ি উত্তর পাড়ায় অবস্থিত কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সরকার মেটাল এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং। ২০১৫ সালে উদ্যোক্তা মোঃ সিহাব উদ্দিন সরকার প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু করেন। শুরু থেকেই কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনের মাধ্যমে স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণ এবং নিজেকে একজন সফল শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখতেন তিনি।
সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে এগিয়ে চলা
ব্যবসার শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটিতে ধাতু গলানোর কাজে কয়লাচালিত কিউপোলা ফার্নেস ব্যবহার করা হতো। প্রচলিত এ প্রযুক্তিতে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হতো। জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের অপচয় এবং পরিবেশগত প্রভাব ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
তবুও থেমে থাকেননি উদ্যোক্তা মোঃ সিহাব উদ্দিন সরকার। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির পরিবর্তন এবং উৎপাদন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তিনি খুঁজছিলেন এমন একটি সমাধান, যা উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে আরও দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব করে তুলবে।
২০২৪ সালে শুরু হয় দিনবদলের গল্প
সরকার মেটাল এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রকৃত পরিবর্তনের সূচনা হয় ২০২৪ সালে। বিশ্বব্যাংক ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় গ্রাম উন্নয়ন কর্ম (গাক) কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন Sustainable Microenterprise and Resilient Transformation (SMART) প্রকল্পের মেশিনারি ও যন্ত্রাংশ উপ প্রকল্প উদ্যোক্তার পাশে দাঁড়ায়।
প্রকল্পের আওতায় মোঃ সিহাব উদ্দিন সরকার পান ১০ লাখ টাকা ঋণ সহায়তা ও ১ লাখ টাকা অনুদান। এই অর্থায়ন তাঁর প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং ইনডাকশন ফার্নেস প্রযুক্তি ব্যবহারের পথ সুগম করে।
প্রচলিত কয়লাচালিত কিউপোলা ফার্নেসের পরিবর্তে আধুনিক ইনডাকশন ফার্নেস ব্যবহারের ফলে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আসে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। ইনডাকশন ফার্নেসে তড়িৎচৌম্বকীয় আবেশের মাধ্যমে ধাতু গলানো হয়। ফলে কয়লা পোড়ানোর প্রয়োজন হয় না এবং ধোঁয়া ও জ্বালানিজনিত স্থানীয় বায়ুদূষণ কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি ধাতু গলানোর প্রক্রিয়ায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদন ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা পাওয়া যায়।
উৎপাদন খরচ কমেছে ২০-৩০ শতাংশ
আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সুফল এসেছে উৎপাদন ব্যয়ে। উদ্যোক্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইনডাকশন ফার্নেস ব্যবহারের ফলে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন খরচ প্রায় ২০-২৫ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে কাঁচামালের অপচয় কমেছে প্রায় ৫ শতাংশ।
উৎপাদন খরচ ও কাঁচামালের অপচয় কমে আসায় প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যবস্থায় দক্ষতা বেড়েছে। ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনায় এসেছে নতুন গতি। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দিয়েছে।
শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ
একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে প্রয়োজন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে SMART প্রকল্পের আওতায় কারখানার শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শ্রমিকদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা, উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা এবং কর্মক্ষেত্রে পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি মানবসম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধিতেও প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে যাচ্ছে।
শিল্পায়নের পাশাপাশি সবুজায়নে বৃক্ষরোপণ
সরকার মেটাল এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অগ্রযাত্রা শুধু উৎপাদন ও ব্যবসায়িক সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবেশ সংরক্ষণেও রয়েছে উদ্যোক্তার বিশেষ উদ্যোগ। প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশগত দায়িত্ববোধের অংশ হিসেবে প্রায় ১২০০টি বিভিন্ন জাতের ফলদ ও বনজ বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে।
বৃক্ষরোপণের এই উদ্যোগ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, কার্বন শোষণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং সবুজ পরিবেশ গড়ে তুলতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। শিল্পায়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে এমন উদ্যোগ টেকসই উন্নয়নের প্রতি উদ্যোক্তার দায়িত্বশীল মনোভাবের প্রতিফলন।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন উদ্যোক্তা মোঃ সিহাব উদ্দিন সরকারের স্বপ্ন তাঁর প্রতিষ্ঠানকে আরও আধুনিক ও বৃহৎ পরিসরে গড়ে তোলা। কৃষি যন্ত্রপাতির উৎপাদন বৃদ্ধি, পণ্যের গুণগত মান উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের কৃষি যান্ত্রিকীকরণে আরও বেশি অবদান রাখতে চান তিনি। তাঁর এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, একজন উদ্যোক্তার সদিচ্ছা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং যথাযথ আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা একত্রিত হলে একটি ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
একজন উদ্যোক্তার পরিবর্তন, টেকসই শিল্পায়নের অনুপ্রেরণা
২০১৫ সালে প্রচলিত কয়লাচালিত কাপোলা ফার্নেস দিয়ে শুরু হওয়া সরকার মেটাল এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের যাত্রা ২০২৪ সালে আধুনিক ইনডাকশন ফার্নেস প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। SMART প্রকল্পের ১০ লাখ টাকার ঋণ সহায়তা, উৎপাদন খরচ ২০-২৫ শতাংশ হ্রাস, কাঁচামালের অপচয় প্রায় ৫ শতাংশ কমানো, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ এবং প্রায় ১২০০টি ফলদ ও বনজ বৃক্ষ রোপণ সব মিলিয়ে এটি একটি ইতিবাচক
প্রকাশক : শহিদুল ইসলাম
সম্পাদক : এম,এস,এ রেজা
প্রকাশক : 01746808322
সম্পাদক : 01712340047
ইমেইল : dailyajkersongram@gmail.com
Copyright © 2026 দৈনিক আজকের সংগ্রাম. All rights reserved.