
মোহাম্মদ আবুল হাশেম, স্টাফ রিপোর্টার :
পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের প্রকল্পের সদস্যদের ঋণের টাকা আত্মসাত ও ভুয়া ঋণ দেখিয়ে অর্থ লুটপাটের অভিযোগ বান্দরবানের লামা শাখার মাঠ-সহকারীদের বিরুদ্ধে। গ্রামাঞ্চলের দারিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করা, তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিসহ নারীর ক্ষমতায়ন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের লক্ষে গ্রহণ করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে উপজেলায় ১৩৯ টি সমিতিতে সদস্য সংখ্যা ১১ হাজার জন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নের মাঠ সহকারী আবদুল্লাহ আল মামুন সোহেল কৌশলে নিজেদের আত্মীয় স্বজনের নামে ঋণ নিয়ে তা নিজে ব্যবহার করে। তার মধ্যে স্ত্রী ফাহমিদা সিদ্দিকারা নামে ১ লাখ, শশুর নাছির উদ্দীনের নামে ৫০ হাজার, নিজের আপন দুই বোন নুসরাত জাহান ও আইরিন জাহানের নামে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিচয় গোপন করে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করে না। এভাবে শুধু সোহেল নই দিলীপ কান্তি সেন তার স্ত্রী, মা, বোনসহ দুই ভগ্নিপতির পরিচয় গোপন করে ৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকা, রেজাউল করিমও তার স্ত্রী, মা, চাচি ও চাচাত ভাইকে দিয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও অংক্যহ্লা মার্মা ৩ লাখ টাকা আত্মসাত করেছেন। আরো অভিযোগ রয়েছে, উপজেলায় ঋণের সকল পাশবই মাঠ-সহকারীরা নিজেদের মধ্যে গচ্ছিত রাখেন। গ্রাহকদের কাছে থেকে ঋণের টউত্তোলন করে তা নিজেরা আত্মসাৎ করে। পাস বই গ্রাহকদের কাছে না থাকায় আত্মসাৎর বিষয়টি অফিসে নজরে আসেনা।
জানা যায়, এই উপজেলার পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের গ্রাহকদের পাস বই মাঠ সহকারীরা নিজেদের কাছে সংরক্ষিত রাখে। মাঠ সহকারীরা গ্রাহকের থেকে ঋণ ও সঞ্চয়ের টাকা উত্তোলনের সময় সাদা একটা কাগজে লিখে দিয়ে আসে, তা যদি গ্রাহকেরা হারিয়ে ফেলে ঋণ ও সঞ্চয়ের টাকার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না।
রুপসীপাড়া ইউনিয়নের রাজা পাড়া গ্রাম উন্নয়ন সমিতির গ্রাহক মো: আয়ুব আলি অভিযোগ করে বলেন, সে ও তার স্ত্রী খতিজা বেগম পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক থেকে ১০ হাজার টাকা করে দুইজনে ২০ হাজার টাকা লোন নিয়েছে। নিয়মিত কিস্তির টাকা আদায় করে কিন্তু তাদের কোন পাস বই না দিয়ে সাদা কাগজে লিখে দিয়ে আসতো মাঠ-সহকারী রেজাউল করিম। সর্বশেষ ৪ হাজার টাকা পরিশোধ করলে তাদের লোন পরিশোধ হয়ে যেতে, কিন্তু মাঠ-সহকারী আরো অতিরিক্ত ১৪০০ টাকা বেশি খুঁজে। আয়ুব আলি অতিরিক্ত টাকা হিসাব চাইলে উল্টো মাঠ-সহকারী তাকে খারাপ আচরণ করে ২ বছরের বেশি সময় কোন সমাধান দিচ্ছে না।
মাঠ-সহকারীদের অনিয়মের বিষয়ে আরো গ্রাহকেরা বলেন, মাঠকর্মীরা আমাদের সাথে সব সময় খারাপ আচরণ করে। তারা স্থানীয় ও দীর্ঘদিন উপজেলায় চাকরি করাতে কেউ প্রতিবাদ করে না। তারা সব সময় পাশ বই বিহীন কিস্তি ও সঞ্চয়ের টাকা উত্তোলন করেন। অনেক মাট সহকারীরা আমাদের টাকা দিয়ে নামে বেনামে এগ্রো ফার্সসহ বিভিন্ন ব্যবসাও পরিচালনা করেন।
অপর সমিতিরি নিয়মিত সদস্য জোবেদা খাতুন, ছফুরা বেগম, আয়েশা বেগম, হেনা আক্তার ও রহিমা বেগম বলেন, আমাদেরকে মাসের পর মাস ঘুরে ঋণ দিতো না, অথচ মাঠ সহকারী রেজাউল করিমের স্ত্রী, মা, বোন, চাচা, চাচি সহ অনেক আত্মীয় স্বজনকে ঋণ দিয়েছে। আমরা এবিষয়ে শাখা ব্যবস্থাপককে অবগত করেছিলাম। তারপর আমাদের সাথে রেজাউল করিম অনেক খারাপ ব্যবহার করে এবং আমাদের জমানো সঞ্চয়ের টাকা ফেরৎ দিয়ে সমিতি থেকে বাহির করে দে।
তারা আরো বলেন, মাঠ সহকারীরা আসলে পূর্বের ফ্যাসিস্ট স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে যোগসাজশ থাকায় কেউ কোন কিছু বলতে পারে নাই। মাঠ সহকারীদের ফলে শাখা লেনদেনের কোন স্বচ্ছতা নেই। গ্রাহকের মনে সব সময় সংশয় থেকেই যায়। এছাড়াও ঋন দানে পক্ষপাত মূলক আচরণ করে প্রতিনিয়ত।
সদস্যদের আরো অভিযোগ, নতুন করে ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সমিতির মাঠ সহকারী তাদের কাছ থেকে অনেক টাকাও আত্মসাত করেছেন।
অপরদিকে, এই শাখার আজিজ নগর ইউনিয়নের দুই শতাধিক গ্রাহকের প্রায় অর্ধকোটি টাকা গত ২০২১ ও ২০২২ সালে আত্মসাত করা হয়। আত্মসাতকৃত টাকার মধ্যে ঋণের কিস্তি বাবদ আদায়কৃত প্রায় ৩৬ লক্ষ টাকা, ভূয়া ঋণ প্রদান বাবদ প্রায় ১৪ লক্ষ টাকা ও সদস্যদের সঞ্চয় বাবদ ৫ হাজার টাকা রয়েছে। অর্থ আত্মসাতের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল ব্যাংকের লামা শাখায় যারা দায়িত্বে থাকা শাখা ব্যাবস্থাপক উবাঞে, ফিল্ড সুপারভাইজার রেজাউল হক, মাঠ সহকারী মোঃ রাসেল, কম্পিউটার অপারেটর আবুল খায়ের ও জুনিয়র অফিসার মাঠ কাঞ্চন কুমার দাশ। জানা যায়, ভূয়া ঋণ ফাইল তৈরীর জন্য মাঠ সহকারী সরাসরি জড়িত এবং ভূয়া ঋণ বিতরণে কম্পিউটার অপারেটরও জড়িত। ভূয়া ঋণ ফাইল তৈরী, সদস্যবিহীন ঋণ বিতরণে শাখা ব্যবস্থাপক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছিলো।
কিন্তু দেখা যায়, বিভাগীয় মামলার চূড়ান্ত আদেশে মাঠ সহাকারী মোঃ রাসেলকে দায়িত্বপালনে অবহেলা, অসদাচরণ, দুর্নীতি ও আত্মসাত মুলক অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ব্যাংক কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা মোতাবেক চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। একই বিভাগীয় মামলার আদেশে পৃথক কর্মী সংক্রান্ত ঘোষণায় কম্পিউটার অপারেটর আবুল খায়ের, শাখা ব্যবস্থাপক উবাঞে ও জুনিয়র অফিসার (মাঠ) কাঞ্চন কুমার দাশের গত ০১ জুলাই ২০২৪ সালে দুটি বার্ষিক বর্ধিত বেতন কখনো প্রাপ্য হবেন মর্মে আদেশ দেওয়া হয়। এরপর অলৌকিক ভাবে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের উর্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে বিশেষ সখ্যতা সৃষ্টি করে কম্পিউটার অপারেটর আবুল খায়ের ও শাখা ব্যবস্থাপক উবাঞে তাদের উপর আরোপিত বর্ধিত বেতন বাতিলের শাস্তি প্রত্যাহার করিয়ে নেন। একই সাথে তারা পদোন্নতি প্রাপ্ত হয়ে নিজেদের পছন্দনীয় জায়গায় বদলী হয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে মাঠ সহকারী রেজাউল করিম বলেন, আত্মীয় স্বজনদের ঋণ প্রদানে পক্ষপাত মূলক আচরণটা টিক, কারণ আমার যে ইউনিয়নে বাড়ি আমি সে ইউনিয়নে কাজ করি। পাস বই বিহীন ঋণের টাকা উত্তোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, অডিট করার সময় পাস বই অফিসে দরকার সে কারণে অফিসে রেখে দি।
মাঠ সহকারীদের অভিযোগের বিষয়ে লামা উপজেলা শাখা ব্যবস্থাপক মো: মহি উদ্দিন বলেন, আমার কাছে কোন গ্রাহক লিখিত অভিযোগ দিলে তা আমি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
এ বিষয়ে বান্দরবান জেলা আঞ্চলিক কর্মকর্তা প্রিয়াংকা মিত্র বলেন, আমি এমন কোনো অভিযোগ শুনি নাই। কোন প্রমাণ তাকলে আমাকে দিন, আমি ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।