
মোঃ মাসুদ বিপ্লব,
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধিঃ
ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়া রেলস্টেশন এলাকায় গেলে প্রথম দর্শনে অনেকেই বিস্মিত হবেন। রেললাইনের ওপর চোখ রাখলে মনে হতে পারে, লাল গালিচা বিছানো হয়েছে বিস্তীর্ণ পথে। কিন্তু কাছে গেলেই পরিষ্কার হয়—সেগুলো আসলে পাকা মরিচ। মরিচ শুকাতে রেললাইন ব্যবহার করছেন এলাকার কৃষকেরা।
প্রতিদিন ভোরবেলা মরিচভর্তি বস্তা নিয়ে রেললাইনের ধারে হাজির হন স্থানীয় কৃষকেরা। রেললাইনের দু’পাশ ও মাঝখানে পাটি ও মাদুর বিছিয়ে দেওয়া হয়। তারপর সেখানে মেলে দেওয়া হয় রক্তিম মরিচ। দিনের আলোয় মরিচগুলো রোদে শুকিয়ে প্রস্তুত হয় বাজারজাতকরণের জন্য। শুকনো মরিচের দাম কাঁচা মরিচের তুলনায় বেশি হওয়ায় লাভের আশায় কৃষকেরা এই পদ্ধতিই বেছে নিয়েছেন।
চাষি এরশাদ আলী জানান, “কাঁচা মরিচে দাম কম। তাই আমরা শুকিয়ে বিক্রি করি। এতে লাভ বেশি হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ব্যবসায়ীরা ট্রাক নিয়ে এসে এখান থেকেই মরিচ কিনে নিয়ে যান।”
ব্যবসায়ী রমজান আলী বলেন, “ঠাকুরগাঁওয়ের মরিচের ঝাঁজ, রঙ ও স্বাদ দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভালো। এখানকার মরিচের বাজার মূল্যও বেশি। প্রতিদিন এই স্টেশন এলাকা থেকেই ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার মরিচ কেনাবেচা হয়।”
বগুড়া থেকে আসা ব্যবসায়ী মহসিন আলী জানান, “রুহিয়ার মরিচ খুবই জনপ্রিয়। রঙ গাঢ়, ঝাঁজ তীব্র—বাজারে কদর রয়েছে। প্রতিদিনই লাখ লাখ টাকার লেনদেন হয় এখানে।”
স্থানীয় কৃষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “প্রতি বিঘা জমিতে ১০-১২ মণ পর্যন্ত ফলন পেয়েছি। এবার বাজারও ভালো। প্রতি মণ মরিচ ৬ হাজার ৫শ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। খরচ বাদ দিয়েও লাভ যথেষ্ট থাকবে।”
রুহিয়া স্টেশন সংলগ্ন কুজিশহর, আসানগড়, হরিপুর, রানীশংকৈল, পীরগঞ্জসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় গ্রীষ্মকালীন মরিচ চাষ হয়েছে। মাঠজুড়ে মরিচ গাছে ঝুলছে লাল-সবুজ পাকা মরিচ। খেত থেকে তুলে বাড়ির উঠানে রোদে শুকানো হচ্ছে সেগুলো। চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে ঝাঁজালো মরিচের ঘ্রাণ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ঠাকুরগাঁওয়ের পাঁচটি উপজেলায় ১ হাজার ৯৭০ হেক্টর জমিতে মরিচের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৩২২ হেক্টরের মরিচ ইতিমধ্যে কাটা হয়েছে। হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন ১.৯২ মেট্রিক টন।
জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক আলমগীর কবীর বলেন, “চাষিদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও সেবা প্রদান করা হয়েছে। ফলনও ভালো হয়েছে। এখানকার মাটি ও আবহাওয়া মরিচ চাষের জন্য খুব উপযোগী। এ বছর দাম ভালো পাওয়ায় চাষিরা বেশ খুশি।”
ঠাকুরগাঁওয়ের এই লাল মরিচ এখন শুধু জেলার গর্ব নয়, দেশের বিভিন্ন বাজারেও সমাদৃত। রুহিয়ার রেললাইন যেনো মরিচ চাষিদের জন্য সাফল্যের পথ হয়ে উঠেছে।