
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি :
ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। ৪৫ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে বুধবার ভর্তি ছিল ২১৫ শিশু। শয্যা ছাড়িয়ে ওয়ার্ডের মেঝে ও বারান্দায়ও রাখা হয়েছে রোগীদের। এরপরও জায়গা না পেয়ে কয়েক দিন ধরে হাসপাতালের মূল ফটকের সামনের গাছতলায় বিছানা পেতে শিশুদের নিয়ে অবস্থান করছেন অভিভাবকেরা। খোলা আকাশের নিচেই চলছে অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসা।
হাসপাতালের গাছতলায় দেখা যায়, বিছানা পেতে শুয়ে-বসে আছেন কয়েকজন অভিভাবক। তাঁদের পাশেই অসুস্থ শিশু। কোনো শিশুর হাতে চলছে স্যালাইন, কেউ অপেক্ষা করছে চিকিৎসক কিংবা ওষুধের জন্য। হাসপাতালের ভেতরে জায়গা না পেয়ে বাধ্য হয়েই বাইরে অবস্থান করছেন তাঁরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, শিশু ওয়ার্ডের ধারণক্ষমতা ৪৫ শয্যা হলেও বুধবার সেখানে ভর্তি ছিল ২১৫ শিশু। অতিরিক্ত রোগীর চাপে ওয়ার্ডে তৈরি হয়েছে অস্বাস্থ্যকর ও অসহনীয় পরিবেশ। গরম, বিশুদ্ধ পানির সংকট, অপরিচ্ছন্ন শৌচাগার এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী বাইরে থেকে কিনতে হওয়ার অভিযোগও করেছেন রোগীর স্বজনেরা।
হাসপাতালের শিশু বিভাগের সিনিয়র স্টাফ নার্স তাজনেহার বলেন, শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া রোগীদের অধিকাংশই শ্বাসকষ্ট, জ্বর, সর্দি-কাশি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত।
পঞ্চগড়ের বিউটি বেগম তাঁর ১৭ মাস বয়সী নাতিকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন। শিশুটি জন্ম থেকেই বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছে। এবার টাইফয়েড ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বিউটি বেগম বলেন, ওয়ার্ডের ভেতরে প্রচণ্ড গরম ও ভিড়। একটি বিছানায় দুই থেকে তিনটি শিশুকে রাখা হচ্ছে। শিশুরা কান্নাকাটি করে, ভেতরে থাকতে চায় না। তাই বেশির ভাগ সময় নাতিকে বাইরের খোলা বাতাসে রাখতে হয়। স্যালাইন ও ইনজেকশন দেওয়ার সময় শুধু ভেতরে নেওয়া হয়।
হাসপাতালের পরিবেশ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, রোগীর তুলনায় শৌচাগার কম। নারী-পুরুষকে একই শৌচাগার ব্যবহার করতে হচ্ছে। খাওয়ার পানিরও সংকট রয়েছে। রাস্তার পাশের টিউবওয়েল থেকে পানি আনতে গেলেও অনেক সময় তা ব্যবহার করা যায় না। তখন হোটেল থেকে পানি কিনে আনতে হয়।
পঞ্চগড়ের জগদল সর্দারপাড়ার হোসেন আলী তাঁর অসুস্থ শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনি বলেন, একটি বিছানায় দুই থেকে তিনজন রোগী রাখা হচ্ছে। ভেতরে শোয়ার তো দূরের কথা, বসার জায়গাও পাওয়া যায় না। প্রচণ্ড গরম ও অতিরিক্ত ভিড়ে শিশুরা থাকতে চায় না।
বালিয়াডাঙ্গীর বড়পলাশবাড়ীর আবু বকর বলেন, তাঁর শিশু জ্বর নিয়ে দুই দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। কিন্তু হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ পাননি। প্রয়োজনীয় সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। ওয়ার্ডে ফ্যান থাকলেও প্রচণ্ড গরমে শিশুটি কান্নাকাটি করছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ফিরোজ জামান জুয়েল বলেন, সমস্যাগুলো সমাধানে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলী ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগকে বিষয়গুলো জানানো হয়েছে। শৌচাগার ও পানির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ না পাওয়া এবং ক্যানুলা নিয়ে অভিভাবকদের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজারকে জানানো হবে। ওষুধের বিষয়ে স্টোরকেও ডাকা হবে। পরিচ্ছন্নতার জন্য সুইপারদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।
রোগীর অতিরিক্ত চাপের বিষয়টি স্বীকার করে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বলেন, ৪৫ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে কখনো ২৫০ জনের মতো শিশুও ভর্তি থাকে। শিশুদের সঙ্গে মা-বাবাও হাসপাতালে অবস্থান করেন। ফলে ওয়ার্ডে মানুষের চাপ আরও বেড়ে যায়।