
মোঃ রাজিব
পটুয়াখালী প্রতিনিধি:
পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলায় প্রাকৃতিক ভাবেই বিস্তৃর্ণ লোনা পানি জমিতে গড়ে উঠেছে গোল বাগান। আর এই প্রাকৃতিক ভাবে গড়ে উঠা গোল বাগান থেকে আহরিত রস থেকে তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু গুড়। দিন যত যাচ্ছে ততই জনপ্রিয় হচ্ছে প্রাকৃতিক রসের গুড়ের চাহিদা।
গোলের গুড়ের তৈরি পায়েস কিংবা মুখরোচক খাবার পছন্দ করেন না এমন মানুষ খুবই কম আছে। মিষ্টিতে সুগার থাকায়
সুস্বাদু বাহারি অনেক রকম খাবার খেত পারেন না অনেকেই। তবে প্রাকৃতির সৃষ্ট গোল বাগান থেকে আহরিত রস অথবা গুড়ে সুগার কম থাকায় দিন দিন ক্রেতার কাছে গোলের গুড়ের চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ। বাংলাদেশের উপকূলী পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলায় বিস্তীর্ণ এলাকায় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল থাকায় প্রাকৃতিক ভাবেই জন্ম নিয়েছে গোল গাছ। কিন্তু চাহিদা বাড়লেও পর্যায় ক্রমে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বাগান। যার ফলে বাগানের পাশাপাশি কমছে গাছিদেরও সংখ্যা। গোল বাগান নষ্ট হওয়ার ফলে গুড় উৎপাদন কমে যাওয়ায় এখন অনেক গাছিরাও করছেন পেশার পরিবর্তন। ফলে রাষ্টীয় ভাবে বাগাম রক্ষা ও নদীর তীর অথবা লোনা জলাশয়ে গোল বনায়নের দাবী গোলচাষী এবং গাছিদের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, এই গোল বাগান থেকেই বছরের প্রায়ই ৪ মাস সময় ধরে দুই দশক যাবৎ রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করার মাধ্যমে জীবিকা চলছে প্রায় ৮ শতাধিক পরিবারের। শীতের শুরুতেই বিকালে গোল গাছের ফলের ডগা কেটে হাড় পাতেন গাছিরা। রাতভর হাড়িতে জমা রস পাখি ডাকা সকালে সংগ্রহ করেন তারা। পরে তাফালে জাল দিয়ে কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে তৈরী হয় গুড়। আর এসব গুড় গাছিরা বিক্রি করেন ১৮০ টাকা থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে। বিশেষ করে রোগে আক্রান্ত মানুষের কাছে লবনাক্ত গুড়ের চাহিদা বেশি।
পৌর শহরের ০৫নং ওর্য়াডের এক বাসিন্দা জানান আমার ডায়াবেটিস এর জন্য সব ধরনের মিষ্টি খেতে নিষেধ করেছেন ডাক্তাররা। তবে লবনাক্ত গুড়ে সুগার কম থাকায় আমি মাঝে মধ্যেই সীমিত গোল গুড় খেতে পারি। তাতে আমার সমস্যা হয়না। এদিকে গুড়ের ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বাগান কমে যাওয়া কাঙ্খিত রস সংগ্রহ করতে পারছেন গাছিরা। এছাড়াও বাগান ধ্বংসের ফলে আয় রোজগার কমে যাওয়ায় পেশার পরিবর্তন করেছেন অনেকই। গুড়ের উৎপাদন কমে যাওয়ায় গোলগাছ সংরক্ষণের দাবী কৃষি বিভাগেরও। নীলগঞ্জ ইউনিয়নের নবীপুর
গ্রামের এক গোল গাছি জানান, কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ, তেগাছিয়া, নবীপুর গ্রামের প্রায় ২৫ জন কৃষক এই কাজের সম্পৃক্ত। ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীরা বাড়িতে গিয়ে অগ্রিম টাকা দিয়ে আসেন গুড়ের জন্য। কিন্তু ক্রমাগত বাগান ধ্বংসের ফলে এখন ক্রেতাদের মেটাতে পারছেন না তারা। তার দাবি বেরিবাধের বাহিরে সরকারি খাস জমিতে গোল গাছ লাগিয়ে আমাদের দায়িত্ব দিলে রক্ষণাবেক্ষণ সহ এই শিল্পকে এগিয়ে নিতে পারতাম। একই গ্রামের ৮০ বছর বয়সী শিল্পি রানী বলেন, আমি ৬০ বছর ধরে এই কাজ করছি শুরুতে প্রতি ১০ থেকে ১৫ কলস গোল গাছ থেকে রস পেতাম। এখন ৮ কলস রস পাই মাঝখানে বন্যার কারণে বাহড়ে কম হত এখন আবার হচ্ছে।
নবীপুর গ্রামের এক গাছি বলেন, তার পূর্বপুরুষ থেকে ১০০ বছর ধরে এই পেশার উপর নির্ভরশীল হয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। তার স্ত্রী বলেন স্বামীর সাথে দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে গুড় তৈরিতে কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে যোগান দিয়ে আসছেন। কিন্তু বর্তমানে গোল গাছের সংকটে তাদের পেশা প্রায়ই পরিবর্তনের দিকে ধাপিত হচ্ছে। তিনি বলেন এর আগে আমার ছেলে মেয়ে ও পুত্রবধুরাও এই কাজে সংশ্লিষ্ট ছিল। তারা পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় যোগ দিয়েছেন। শুধু তাই নয় গাছিরা বলছেন প্রকৃতি রক্ষা এবং ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে নবায়নের পাশাপাশি গোলগাছ সংরক্ষণের কোন বিকল্প নেই। খুব দ্রুত সরকারের উদ্যেগ নেওয়া উচিত।
কলাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এমআর সাইফুল্লাহ বলেন, গোল গাছ মানুষের ঘর নির্মানসহ প্রকৃতি রক্ষায় একটি বড় ভূমিকা রাখে। এছাড়া গুড় থেকে বিশাল একটা অর্থ
আয়ের পাশাপাশি অনেক মানুষ এর উপর নির্ভরশীল হয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। এমনকি ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষ সহনশীল পরিমাণে গোল গুড় খেতে পারে বলে আমরা জানতে পেরেছি। গোল বাগান রক্ষা করার জন্য উর্ধ্বতন কর্মকতার কথা হয়েছে যাতে গোল বাগান রক্ষার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।