
মোঃ মনিরুজ্জামান তালুকদার
কলাপাড়া(পটুয়াখালী)প্রতিনিধি।
দুর্গম পথ পেরিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতেই পা পিছলে পড়ে যান এক প্রসূতি মা। দুর্ঘটনার কবলে পড়ে অদূরেই সন্তান প্রসব করেন তিনি। আর দুর থেকে দাঁড়িয়ে এমন করুণ দৃশ্য দেখে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন মানবিক কৃষক। ঠিক তখনই বিবেক অধিষ্ঠিত হয়ে পড়েন। সিদ্ধান্ত নেন, যে করেই হোক বাঁধ নির্মাণসহ মানুষ চালাচলের উপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। তাই বানভাসী মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে পৈত্রিক সম্পত্তি বিক্রি করে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
মো. কামাল হোসেন গাজী একজন সফল কৃষক হিসেবে সুখ্যাতি রয়েছে তার।কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউপির কুমিরমারা গ্রামের মৃত জেন্নাত আলী গাজীর ছেলে তিনি। তার মূল পেশা কৃষিকাজ হলেও স্থানীয়দের কাছে দানশীল কামাল নামে বেশ পরিচিত। তবে নিজ গ্রামে এবার মানুষের জন্য ব্যক্তি অর্থায়নে রক্ষাবাঁধ নির্মাণ করে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, অসামান্য এই অনিন্দ্য সুন্দর কাজের মধ্যে দিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাবে শতাধিক পরিবার। একই সঙ্গে স্কুল কলেজগামী শিক্ষার্থীরাও এই বাঁধ দিয়ে নিরাপদে পৌঁছাতে পারবে পাঠশালায়।
৯০ বছর বয়সী প্রবীণ বাসীন্দা হোসেন আলী জানান, আন্ধারমানিক নদী লাগোয়া কুমিরমারা ও তেগাছিয়া খেয়াঘাট সংলগ্ন এই এলাকায় প্রায় তিন শতাধিক মানুষের বসবাস। এই বাঁধটির অভাবে প্রতি বছরই দুর্যোগের সময় সব হারানোর শঙ্কায় থাকতেন নদী পাড়ের মানুষগুলো। স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চ জোয়ার কিংবা বন্যা হলেই ভাসিয়ে নিয়ে যেত ঘরবাড়িসহ ঘের পুকুরের মাছ। সরল জমি দিয়ে লোনা পানি প্রবেশ করে বিনষ্ট হয়ে যেত ক্ষেতের ফসল। বন্ধ হয়ে যেত মানুষের চলাচল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই বাঁধটি নির্মাণের জন্য মানববন্ধনসহ একাধিক কর্মসূচি পালন করেও কাজে আসেনি। এগিয়ে এসেছে আমাদের কামাল। তাই লাঠিতে ভর করে এসে কাজে হাত লাগিয়েছেন তিনিও।
অপর বাসিন্দা সালাম জোমাদ্দার জানান, কয়েকযুগ পর আমাদের কষ্ট লাঘব হতে চলেছে। তাই কৃষক কামালকে ধন্যবাদ দেয়ার ভাষা হারিয়েছেন তিনি। তবে ব্যক্তি উদ্যোগে বাঁধ নির্মাণের পর পানি নিষ্কাশনের জন্য সরকারের কাছে একটি স্লুইচ গেট নির্মাণ করে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
মানবিক কৃষক কামাল হোসেন বলেন, কেবল তার আত্মতৃপ্তির জন্যই বাবার জমি বিক্রি করে ১২শ ফুট বাঁধ নির্মাণ করেছন। ১৪ ফুট প্রস্থের এই বাঁধ সড়ক হিসেবে ব্যবহার করা যাবে বলে নিজেও অনেক খুশি
তিনি বলেন, আমার সামনে এই পথ দিয়ে এক মা পা পিছলে পড়ে সন্তান প্রসব করেছেন। সেই কান্নার শব্দ আমি ভুলতে পারছি না। তাই বাবার ৩৩ শতক জমি বিক্রি করে প্রায় ৭ লাখ টাকায় এই বাঁধ নির্মাণ করেছি। এখন আর মানুষের ঘরবাড়ি পানিতে নষ্ট হবে না। পুকুরের মাছও ভেসে যাবে না। আর এই পথে কেউ পড়ে আহতও হবে না। নিরাপদে চলতে পারবে। আমার এটুকুই শান্তনা। তবে এ কাজে স্থানীয়রাও অনেকে স্বেচ্ছায় শ্রম দিয়েছেন বলে তাদের সাধুবাদ জানিয়েছেন তিনি।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শংকর চন্দ্র বৈদ্য জানান, অবশ্যই মানবিক ব্যক্তিকে ধন্যবাদ জানাই। এছাড়া আবেদন করলে একটি কালভার্ট নির্মাণের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।