
মোস্তাফিজার রহমান
রংপুর প্রতিনিধিঃ
তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নিয়ে কয়েকদিন আগে আশাবাদী খবর শোনা গিয়েছিল। গত ৯ অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূতের তিস্তা অববাহিকা অঞ্চল পরিদর্শন এবং সেখানে প্রস্তাবিত প্রকল্পে বিনিয়োগের কথা জানানোর পর এই আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিংসহ তিন সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের একটি দল তিস্তা ব্যারেজ এলাকা ও সেচ প্রকল্পসহ পুরো এলাকা ঘুরে দেখেন।
পরিদর্শন শেষে লি জিমিং বলেন, স্থানীয় জনগণের চাহিদা ও কিসে তাদের ভালো হবে তা চীনের কাছে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তিস্তা একটি বড় নদী; এটি খনন করতে পারলে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন হবে। অর্থনীতি, যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। যদিও এ প্রকল্প বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ আছে, তারপরও আমরা এটি করব।
চীনের রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, আমাদের প্রকৌশলীরা বিষয়টি খতিয়ে দেখার পর পরিকল্পনা করব কবে কাজ শুরু করা যায়। শুষ্ক মৌসুমে পানি সঙ্কট দূর করা, তীর ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণে তিস্তা নদী ঘিরে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে, আবহাওয়া, প্রকৃতি-পরিবেশ সবই এই মহাপরিকল্পনার পক্ষে বলে রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন। এটি বাস্তবায়নে ঢাকা-বেইজিং গভীর আলোচনা চলছে বলেও তিনি জানান।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন চীনের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে ভারতের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, ‘তিস্তা নিয়ে আমরা ১২ বছর ধরে দেন-দরবারে আছি, সেখানে গৃহীত প্রকল্পে চীন যদি বিনিয়োগ করে তাতে বাংলাদেশের আপত্তি নেই উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন, ব্যারেজ প্রকল্পের প্রস্তাব অনেক পুরনো। সেটা চীন নতুন করে সামনে এনেছে। এই প্রকল্পে চীন আর্থিক সাহায্য করবে।‘
ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি না হওয়ায় চীনের মাধ্যমে তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নামে একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, কৃত্রিম জলাধার তৈরি করে পানি ধরে রেখে সারাবছর সেচ কাজে ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি ১১৫ কিলোমিটার নদীর পুরো অববাহিকা গভীর খনন ও দুই পাড়ে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হবে। এর ফলে স্থায়ীভাবে ভাঙনরোধ হওয়ার পাশাপাশি ফিরে আসবে বন্দর কেন্দ্রীক যোগাযোগ ব্যবস্থা। নদীর দু’ধারে মেরিন ড্রাইভ তৈরির মাধ্যমে পুরো জনপদ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সড়ক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত হবে। প্রায় পৌনে ২০০ বর্গ কিলোমিটার জমি উদ্ধার হবে। যেখানে গড়ে উঠবে একাধিক শিল্প এলাকা, স্যাটেলাইট শহর। এজন্য চীন ৮ হাজার ২শ কোটি টাকা ঋণ দিতেও প্রস্তুত।
ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানি বন্টন চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার পরও ২০১১ সাল থেকে চুক্তিটি আটকে আছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার চুক্তি স্বাক্ষরের পক্ষে তাদের মনোভাব প্রকাশ করলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির কারণে এতদিন এটি ঝুলে আছে। তবে যে কারণেই তিস্তা পানি বন্টন চুক্তি আটকে থাকুক না কেন, তিস্তা নদীর ভাঙ্গন ও বন্যা কিন্তু থেমে নেই। নদী ভাঙ্গনে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ গৃহ হারাচ্ছেন। বিলীন হচ্ছে হেক্টরের পর হেক্টর ফসলি জমি।
বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারেজ এলাকা থেকে একশ কিলোমিটার উজানে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবা নামকস্থানে ১৯৯৮ সালে ভারত ২.২১কিলোমিটার দৈর্ঘের একটি বাঁধ নির্মাণ করে। এই বাঁধে রয়েছে ৫৪টি গেট বা কপাট। গজলডোবা ব্যারেজ নির্মাণ করা হয়েছে তিনটি লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। এগুলো হলো, প্রথমত- সেচ প্রকল্প, দ্বিতীয়ত- জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং তৃতীয়ত- গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র সংযোগ খাল খনন করে নৌপথ তৈরি করা।
বর্তমানে এই ব্যারেজের মাধ্যমে জলপাইগুড়ি জেলায় ৬১ হাজার, দার্জিলিং জেলায় ১৭ হাজার, মালদাহ জেলায় ৩৮ হাজার, উত্তর দিনাজপুর জেলায় ২ লাখ ৪ হাজার একর জমিতে সেচ প্রদান করা হচ্ছে। গজলডোবা বাঁধের সাহায্যে ভারত দুই হাজার ৯১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ খালের মাধ্যমে একতরফাভাবে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার প্রবাহ থেকে প্রায় দুই হাজার কিউসেক পানি মহানন্দা নদীতে প্রবাহিত করছে। এই পরিম পানি প্রত্যাহারের কারণে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশে পানির প্রবাহ থাকে না বললেই চলে। এ জন্যই আন্তর্জাতিকভাবে প্রবাহিত নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার ভিত্তিতে তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি করতে চায় বাংলাদেশ। কিন্তু ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সমীকরণ না মেলায় এই চুক্তি স্বাক্ষর ঝুলে আছে আর ক্ষতির স্বীকার হচ্ছে তিস্তা পাড়ের বিপুল জনগোষ্ঠি।
কিন্তু ৭ নভেম্বর ভোরের কাগজে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ভূ-রাজনৈতিক চাপের কারণে সমন্বিত তিস্তা প্রকল্প থেকে সরে আসতে হচ্ছে সরকারকে। চীনের সাহায্য নিয়ে তিস্তা প্রকল্পে ভারতের আপত্তি আছে বলেই বিষয়টি ঝুলে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্তত আগামী নির্বাচনের আগে ভারতের জন্য ‘স্পর্শকাতর’ কোনো বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ সরকার হয়তো মনোমালিন্য হওয়ার মতো কিছু করতে চায় না।
ভোরের কাগজের খবরে বলা হয়েছে, তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পটি চীন শ্রমিকনির্ভর প্রকল্প হিসেবে সাজিয়েছে। এই কাজের জন্য শ্রমিক, প্রকৌশলীসহ আড়াই তিন হাজার চীনা নাগরিক নিয়োজিত হবেন। যেখানে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে তার থেকে মাত্র ১১ কিলোমিটার দূরে ভারত সীমান্ত। এই ভূখণ্ডের আকৃতি মুরগির ঘাড়ের মতো হওয়ায় একে বলা হয় ‘চিকেন’স নেক’। এর পূর্ব দিকে নেপাল, পশ্চিমে বাংলাদেশ। মাঝখানে খুব সংকীর্ণ একটি অংশ ভারতের নিয়ন্ত্রণে। এই এলাকাটি ভারতের নিরাপত্তার প্রশ্নে খুবই স্পর্শকাতর। ভারতের সঙ্গে সীমানা নিয়ে চীনের বিরোধ আছে। নতুন করে বাংলাদেশ অংশে বিপুল সংখ্যক চীনা নাগরিকের উপস্থিতি ভারতকে নিরুদ্বেগ রাখবে না। ভারত সীমান্ত থেকে মাত্র ১১ কিলোমিটার দূরে এই প্রকল্পটি পেতে চীনের অতি আগ্রহের বিষয়টিও ভারতের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। আবার এই প্রকল্পের যে সব উপকারের কথা বলা হচ্ছে, তা নিয়েও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে ঐকমত্যের অভাব রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর তিস্তার গর্ভাংশ কমে যাবে। বেশি পরিমাণে জমি জেগে উঠবে। নদীর সীমানা কমে গেলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। নদী প্রকৌশল বিদ্যার বিষয়টি এই প্রকল্প তৈরির ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হয়েছে বলেও মনে করা হয়েছে।
কারিগরি দিক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাজনৈতিক দিকও উপেক্ষা করার মতো নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা মনে করেন, প্রকল্প নিয়ে এখন যে অবস্থা তাতে বাংলাদেশের করণীয় হচ্ছে ভারতের উদ্বেগ নিরসনে কথা বলা। অর্থাৎ ভারত যে উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি নিয়ে নেতিবাচক কথা বলছে, উদ্বেগ প্রকাশ করেছে- কেন করেছে তা বাংলাদেশের খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ ভারত বাংলাদেশের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশি। ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ-ভারত নিরাপত্তা ইস্যুতে একে অন্যকে সহায়তা করছে। ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এমন কোনো কাজও করেনি বাংলাদেশ। ফলে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে তাড়াহুড়ো না করে প্রকল্প নিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা করা উচিত।
ভারতের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর প্রকল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে দেশের বিশেষজ্ঞদেরও মতামত নেওয়া জরুরি। প্রকল্পের যেমন কারগরি ও পরিবেশগত দিক আছে, তেমনি আছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিষয়। তিস্তার পানি বন্টন চুক্তির বিকল্প হিসেবে আমাদের এমন কোনো প্রকল্পে ঝুঁকে পড়া ঠিক হবে না, যেটা এক সময় আমাদের গলার কাঁটা হয়ে ফুটতে পারে। ভারত ও চীন যা করবে সেটা তাদের নিজেদের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে করবে না। তাই আমাদেরও মূল বিবেচনা হবে তাৎক্ষণিক লাভালাভের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদে দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণ করা।