সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৬ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
কুমিল্লা বুড়িচংয়ে ইউপি চেয়ারম্যানসহ আ. লীগের ১৩ নেতাকর্মী আ’ট’ক পাঁচবিবিতে ওসির অ’ভি’যা’নে মা’দ’ক ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে ১৬০ বোতল ফা’য়া’র’ডি’ল উ’দ্ধা’র কুমিল্লায় ১০-বিজিবির অ’ভি’যা’নে ৭৪ লাখ টাকার ভারতীয় শাড়ি উ’দ্বা’র কুমিল্লা ব্রাহ্মণপাড়ায় পৃথক অ’ভি’যা’নে ২৩৫০ ভারতীয় বাজিসহ গ্রে’প্তা’র-১৬ ঠাকুরগাঁওয়ে মিড ডে মিল খেয়ে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৭ শিক্ষার্থী হাসপাতালে দলীয় মনোনয়ন পেলে উন্নয়ন ও জনসেবায় কাজ করার প্রত্যয় শাহ আলমের কুমিল্লায় মা ও ভাতিজিকে কু’পি’য়ে হ’ত্যা, ছেলে আ’ট’ক বিজিবি কর্তৃক রাজশাহী সীমান্তে অ’ভি’যা’ন পরিচালনা করে ৩২ কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের ০১ টি কষ্টি পাথর সদৃশ্য মূল্যবান পাথরের মূ’র্তি আ’ট’ক ন‌ওগাঁর পোরশায় ট্যা’পে’ন্টা’ড’লসহ দুই মা’দ’ক কারবারি আ’ট’ক নিয়ামতপুরে ৫০০ গ্রাম গাঁ’জা’সহ একজন গ্রে’প্তা’র

পরিছন্ন শহরের কারিগর: সুইপারদের জীবন ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি

  • আপডেট সময় : সোমবার, ২৮ জুলাই, ২০২৫
  • ১৮৬ বার পঠিত

এস,এ,রশিদ:

যখন ভোরের আলো ফোটার আগেই নগরবাসী ঘুমের গভীরে নিমগ্ন, তখন একদল মানুষের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। হাতে ঝাড়ু, বেলচা আর ময়লার গাড়ি নিয়ে তারা নেমে পড়েন শহরকে পরিচ্ছন্ন করার মহান ব্রতে। নোংরা আবর্জনা সরিয়ে, ড্রেন পরিষ্কার করে তারা আমাদের জন্য একটি বাসযোগ্য সুন্দর সকাল উপহার দেন। এই মানুষগুলো আমাদের কাছে সুইপার, পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা ঝাড়ুদার নামে পরিচিত। কিন্তু শহরের এই অপরিহার্য কারিগরদের জীবন কেমন কাটে, সে খবর আমরা ক’জনই বা রাখি? তাদের স্বাভাবিক জীবন শুধুই বঞ্চনা, অবহেলা আর সংগ্রামের এক দীর্ঘ গাঁথা।
কর্মপরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি: জীবনের বিনিময়ে পরিচ্ছন্নতা।
সুইপারদের কাজের পরিবেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর। প্রতিদিন তাদের খালি হাতেই বিষাক্ত বর্জ্য, হাসপাতালের পরিত্যক্ত সিরিঞ্জ, পচা-গলা আবর্জনা নাড়াচাড়া করতে হয়। সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার পক্ষ থেকে মাস্ক, গ্লাভস, বুটের মতো প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হলেও, তার গুণগত মান এবং পর্যাপ্ততা নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। অনেক ক্ষেত্রেই এসব সরঞ্জাম ছাড়াই তাদের কাজ করতে দেখা যায়।
এর ফলে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, হেপাটাইটিস-বি ও সি, টিটেনাস এবং ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তাদের নিত্যসঙ্গী। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের অধিকাংশ পরিচ্ছন্নতাকর্মীই কোনো না কোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন এবং তাদের গড় আয়ু সাধারণ মানুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
সামাজিক বঞ্চনা ও বিলুপ্ত মর্যাদা
পরিচ্ছন্নতার মতো একটি মহৎ কাজে নিয়োজিত থাকা সত্ত্বেও সামাজিক দৃষ্টিতে সুইপাররা সবচেয়ে অবহেলিত ও অস্পৃশ্য এক জনগোষ্ঠী। সমাজে তাদের দেখা হয় নিচু জাত হিসেবে। এই পেশায় নিযুক্তদের অধিকাংশই দলিত ও হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ, যারা বংশপরম্পরায় এই কাজ করে আসছেন। ব্রিটিশ আমলে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে তাদের পূর্বপুরুষদের এই কাজে নিয়ে আসা হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতক পরেও তাদের সামাজিক মর্যাদার কোনো উন্নতি ঘটেনি।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকার থেকেও তারা অনেকাংশে বঞ্চিত। তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে সহপাঠী ও শিক্ষকদের কাছ থেকে বৈষম্যের শিকার হতে হয়, যা তাদের শিক্ষাজীবনকে বাধাগ্রস্ত করে। সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা সাধারণত অস্বাস্থ্যকর কলোনি বা মেথরপট্টিতে গাদাগাদি করে বসবাস করতে বাধ্য হন।
অর্থনৈতিক শোষণ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
কাজের গুরুত্ব ও ঝুঁকি বিবেচনায় সুইপারদের বেতন কাঠামো অত্যন্ত নগণ্য। বিভিন্ন পৌরসভায় তাদের মাসিক বেতন এখনো লজ্জাজনকভাবে কম, যা দিয়ে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে একটি পরিবারের ভরণপোষণ প্রায় অসম্ভব। সম্প্রতি তারা ন্যূনতম ১৮,০০০ টাকা বেতনের দাবি জানিয়ে আসলেও তা বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
অধিকাংশেরই কোনো নিয়োগপত্র নেই, নেই চাকরির নিশ্চয়তা। ফলে যেকোনো মুহূর্তে চাকরি হারানোর ভয় তাদের তাড়া করে ফেরে। পেনশন, গ্র্যাচুইটির মতো অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধার কথা তারা কল্পনাও করতে পারেন না। সরকারি পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদে দলিতদের জন্য কোটা ব্যবস্থা থাকলেও, আউটসোর্সিং বা ঠিকাদারি নিয়োগের মাধ্যমে সেই নিয়মকে পাশ কাটানোর অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে তারা আরও বেশি শোষণের শিকার হচ্ছেন।
কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও দাবি-দাওয়া
বছরের পর বছর ধরে সুইপাররা তাদের ন্যায্য অধিকারের জন্য দাবি জানিয়ে আসছেন। উন্নত কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসম্মত সুরক্ষা সরঞ্জাম, মর্যাদাপূর্ণ বেতন কাঠামো এবং সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণের দাবিতে তারা বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন ও কর্মবিরতির মতো কর্মসূচি পালন করলেও কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি। তাদের সমস্যা সমাধানে সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও মাঠ পর্যায়ে তার বাস্তবায়ন প্রায়শই অনুপস্থিত থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, একটি সভ্য সমাজে পেশার ভিত্তিতে মানুষকে বিচার করার কোনো সুযোগ নেই। সুইপারদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং তাদের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাদের কাজের স্বীকৃতি ও যথাযথ মর্যাদা প্রদান না করতে পারলে, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠন সম্ভব নয়।
সাভার সুইপার জনকল্যাণ সমিতির সভাপতি মো: সুলতাল শেখ বলেন শহরকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখার এই নীরব সৈনিকদের জীবনের অন্ধকার দিকটি যতদিন না আলোকিত হবে, ততদিন আমাদের নাগরিক সভ্যতা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। তাদের ঝাড়ুর প্রতিটি আঁচড়ে যেমনি শহর পরিচ্ছন্ন হয়, তেমনি তাদের জীবনের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে আমাদের সামাজিক অবহেলার চিত্রটিই প্রকট হয়ে ওঠে।

সংবাদটি শেয়ার করুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরও খবর

ফেসবুকে আমরা

© All rights reserved © 2022 daily Ajker Songram
Customized By Shakil IT Park