
শাহেদ আহমেদ, সাতক্ষীরা:
একটি তরতাজা প্রাণের মর্মান্তিক বিদায়ে শোক ও ক্ষোভে ফুঁসছেন স্বজন ও সচেতন নাগরিকেরা। যে বয়সে একজন কলেজছাত্রের স্বপ্ন দেখার কথা, ভবিষ্যৎ গড়ার কথা, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর কথা, সেই বয়সেই ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারাতে হয়েছে জাকারিয়াকে। তাঁর এমন নির্মম মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে স্বজনদের মধ্যে। অন্যদিকে হত্যাকাণ্ডের দেড় সপ্তাহ পার হলেও মামলার সব আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে সাতক্ষীরার মানুষের মধ্যে। জাকারিয়া হত্যার সব আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার, সুষ্ঠু বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে সাতক্ষীরা নিউমার্কেট চত্বরে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার দুপুরে জাকারিয়া হত্যার বিচার বাস্তবায়ন কমিটির উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কমিটির উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট আজাদ হোসেন বেলাল এবং সঞ্চালনা করেন সদস্যসচিব শেখ মাসুম বিল্লাহ শাহীন। কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন বিচার বাস্তবায়ন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ পাঁড়, সাংবাদিক আবুল কাসেম, অ্যাডভোকেট আকবার হোসেন, অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম, মশিউর রহমান, কামরুজ্জামান রাসেল, ছাত্রনেতা শেখ আবু রায়হান, মো. নূরুন্নবী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আল ইমরান, শ্রমিক নেতা আজিজ বাবু, নবাবজান ও অজিয়ার রহমানসহ অন্যরা। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, জাকারিয়া হত্যাকাণ্ডের দেড় সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও পুলিশ এখনো সব আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। একজন কলেজছাত্রকে হত্যা করা হয়েছে, একটি পরিবার হারিয়েছে তাদের প্রিয় সন্তানকে; অথচ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সব আসামিকে এখনো আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। এ পরিস্থিতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বক্তারা আরও বলেন, পুলিশের এই ব্যর্থতা শুধু পুলিশের নয়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও এটি বড় প্রশ্ন তৈরি করে। নাগরিকের জীবন রক্ষা করা, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই এ দায় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে এবং তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করতে হবে। তাঁরা বলেন, জাকারিয়ার মতো একজন তরুণের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু সমাজের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অপরাধীরা দ্রুত আইনের আওতায় না এলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়বে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হবে। হত্যা মামলার প্রধান আসামি নাহিদকে গ্রেপ্তার করা হলেও শুধু একজন বা কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেই পুলিশের দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। মামলার বাকি আসামিদেরও অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে। পুলিশের সক্ষমতা ও দায়িত্বশীলতার প্রমাণ দিতে হলে এ মামলার সব আসামিকে আইনের আওতায় আনা জরুরি। অন্যথায় পুরো জেলাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন বক্তারা। তাঁরা আরও বলেন, জাকারিয়ার পরিবার যে অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হয়েছে, তা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে স্বজনদের বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা পূরণ হতে পারে। এ জন্য মামলার তদন্তে কোনো ধরনের গাফিলতি না রেখে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিক্ষোভ ও মানববন্ধন থেকে বক্তারা মামলার বাকি আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার দাবি জানান। তাঁরা বলেন, কোনো অপরাধী যেন আইনের ফাঁক গলে পার পেয়ে যেতে না পারে। জাকারিয়া হত্যার বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ২ অক্টোবর শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে সাতক্ষীরা শহরের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রধান ফটকের পাশে একটি চায়ের দোকানে বিরোধের সূত্রপাত হয়। দোকানমালিক রবিউল ইসলামের ভাতিজা বাপ্পি হাসানের সঙ্গে নাহিদসহ কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরোধ বাধে। এ সময় বাপ্পি হাসানকে রক্ষা করতে এগিয়ে যান কলেজছাত্র জাকারিয়া। কিন্তু অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে তাঁকেই নাহিদের ছুরিকাঘাতের শিকার হতে হয়। গুরুতর আহত জাকারিয়াকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নিহতের ভাই শাহারিয়ার খান বাদী হয়ে শনিবার রাতে সাতক্ষীরা সদর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ১২ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও সাতজনকে আসামি করা হয়। পুলিশ এ মামলার প্রধান আসামিসহ এ পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানা গেছে। তবে বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় তাঁদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন বিচার বাস্তবায়ন কমিটির নেতারা। জাকারিয়া হত্যাকাণ্ডের বিচার ঘিরে সাতক্ষীরায় মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়েছে, তা অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। বক্তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত সব আসামিকে গ্রেপ্তার করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে। তাঁদের দাবি, একজন কলেজছাত্রের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর বিচার যেন দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনিশ্চয়তার মুখে না পড়ে এবং অপরাধীরা যেন কোনোভাবেই আইনের ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ না পায়।