
মোঃ মাসুদ বিপ্লব ঠাকুরগাঁও থেকে:
ঠাকুরগাঁও জেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের কচুবাড়ি মাদারগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে সাধারণ মানুষ, ছাত্র-ছাত্রী ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দিন সংঘটিত এ মর্মান্তিক ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল রোববার (৯ মার্চ) সকাল থেকেই শহরের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।বিক্ষোভে উত্তাল শহর, ধর্ষকের ফাঁসির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে আদালত পাড়ায়।রোববার সকাল থেকে ঠাকুরগাঁও শহরে নাগরিক সমাজের ব্যানারে এক বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী, সুধীজন ও সাধারণ মানুষ আদালত পাড়ায় জড়ো হয়ে ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। তাঁরা দাবি তোলেন, ধর্ষকের পক্ষে যেন কোনো আইনজীবী আইনি লড়াই না করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনীও মোতায়েন করা হয়।উল্লেখ্য, গত শনিবার কচুবাড়ি মাদারগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোজাম্মেল হক মানিক বিদ্যালয়ের ছুটির দিন অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়ার নামে ওই ছাত্রীকে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করেন। ঘটনার পর শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়লে স্থানীয়রা তাকে প্রথমে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করে এবং ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে সাংবাদিকদের তৎপরতায় শিশুটিকে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক ইসরাত ফারজানা দ্রুত হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে শিশুটির শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন এবং আইনি সহায়তার আশ্বাস দেন। ঠাকুরগাঁওয়ের ধর্ষণের পাশাপাশি দেশের নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।নারীর প্রতি সহিংসতা বাংলাদেশে একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি হয়ে উঠেছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান এইড ইন্টারন্যাশনাল এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২০২৪ সাল পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে কমপক্ষে ১১,৭৫৮ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৬,৩০৫ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।বিশেষ করে শিশুদের উপর নির্যাতনের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।ধর্ষণের শিকারদের মধ্যে ৫৫% কিশোরী ও শিশু (৩,৪৭১ জন)।১,০৮৯ জন নারী ও শিশু সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।২০৭ জন ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে, যার মধ্যে ১১৮ জন শিশু।৫০ জন নারী সহিংসতার ট্রমা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন।যৌতুক-সম্পর্কিত সহিংসতায় ৩৫৫ জন নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার, যাদের মধ্যে ২৬ জন আত্মহত্যা করেছেন।
২০২৫ সালেও থামেনি সহিংসতা তা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।২০২৫ সালের প্রথম দুই মাসেও একই ধারা অব্যাহত রয়েছে।২২৪ জন নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেন।১০৭ জন ধর্ষণের শিকার, যাদের মধ্যে ৬৬ জন শিশু।২৭ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার।৫৮ জন নারী পারিবারিক সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে ২০ জন আত্মহত্যা করেছেন।একজন নারী অ্যাসিড হামলায় মারা গেছেন।
নারীর প্রতি সহিংসতার কারণ হিসেবে দেখা গেছে।এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—কুসংস্কার ও ধর্মীয় অনুশাসনের অজুহাতে শিক্ষাক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ কমানো ,নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়নে বাধা,আইনের দুর্বল প্রয়োগ,সামাজিক ও পারিবারিকভাবে ধর্ষকদের পক্ষে সুরক্ষা প্রদান
বিচার ও প্রতিকার দাবিতে ঠাকুরগাঁওয়ের জনগণ ধর্ষকের দ্রুত বিচার ও ফাঁসির দাবি জানিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দোষীকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে।নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞসহ সচেতন নাগরিক ও ছাত্র – ছাত্রীরা।