
মোঃ মাসুদ বিপ্লব
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি :
উৎপাদনের দিক দিয়ে দেশের অন্যতম গম উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে পরিচিত ঠাকুরগাঁও। উত্তরের এই জেলার উর্বর মাটি ও অনুকূল আবহাওয়া দীর্ঘদিন ধরে গম চাষের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। প্রতিবছর এখান থেকে সরকারও সর্বাধিক পরিমাণ গম সংগ্রহ করে থাকে। তবে লাভ কমে যাওয়ায় দিন দিন গম চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন কৃষকরা। গমের পরিবর্তে ভুট্টা, ধান ও বিভিন্ন সবজি চাষের দিকে ঝুঁকছেন তারা।
জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, অনেক মাঠেই এখন গমের গাছ সোনালি রঙ ধারণ করেছে। আর কয়েকদিনের মধ্যেই শুরু হবে গম কাটা-মাড়াইয়ের কাজ। কিন্তু আগের তুলনায় গমের ক্ষেতের পরিমাণ কমে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
কৃষকদের অভিযোগ, ক্ষেত প্রস্তুত থেকে শুরু করে বীজ বপন, সার, কীটনাশক, সেচ এবং ফসল কাটার খরচ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। কিন্তু বাজারে গমের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। ফলে কৃষকরা গমের পরিবর্তে অধিক লাভজনক ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ঠাকুরগাঁও জেলায় ৩১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে গম আবাদ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে ৪ দশমিক ০৩ টন ফলন ধরে মোট ১ লাখ ২৬ হাজার ৯৪৫ মেট্রিক টন গম উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এ পর্যন্ত অগ্রগতি হিসেবে প্রায় ২১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন উৎপাদন দেখানো হয়েছে।
সদর উপজেলার নারগুন বোচাপুকুর পোকাতি গ্রামের কৃষক মো. সোহেল রানা বলেন, “আগে কয়েক বছর গম চাষ করতাম। কিন্তু গমে লাভ কম হওয়ায় এখন ভুট্টা আবাদ করছি।”
একই এলাকার কৃষক বুলবুল আহমেদ ও ধনিবুল্লাও জানান, গম চাষ ছেড়ে তারা এখন ভুট্টা চাষে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
সদর উপজেলার সালন্দর ইউনিয়নের বরুনাগাঁও ঘাটপাড়া এলাকার গমচাষি ভুট্টু ইসলাম বলেন, “গমের তুলনায় ভুট্টা ও আলুর উৎপাদন বেশি হয় এবং বাজারে দামও ভালো পাওয়া যায়। এক বিঘা জমিতে গম আবাদ করতে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। সেখানে উৎপাদিত গম বিক্রি করে সর্বোচ্চ ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা পাওয়া যায়। অন্যদিকে এক বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করে ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়, তাই ভুট্টা চাষই বেশি লাভজনক।”
সদর উপজেলার রহিমানপুর ইউনিয়নের ছিট চিলারং গ্রামের কৃষক মো. দারুল ইসলাম বলেন, “গমের ফলন ভালো হয়, কিন্তু বাজারে দাম পাই না। সরকার যদি ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করে, তাহলে অনেক কৃষক আবার গম চাষে আগ্রহী হবে।”
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. মাজেদুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে ভুট্টা, ধান ও বিভিন্ন শাকসবজির আবাদ বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং এসব ফসলের বাজারমূল্য ভালো থাকায় কৃষকরা সেসব ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে জেলায় গমের আবাদ কিছুটা কমেছে।
তিনি আরও জানান, কৃষি বিভাগ গম চাষীদের উচ্চ ফলনশীল জাত ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে উন্নত হাইব্রিড জাত ও বাজারে ভালো মূল্য নিশ্চিত করা গেলে জেলায় আবারও গমের আবাদ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।