
মোঃ মাসুদ বিপ্লব ঠাকুরগাও।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, বিশেষত ঠাকুরগাঁও ভৌগলিক ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত (৩ এপ্রিল) বৃহস্পতিবার ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে বলেছে চিকেন নেক করিডোর অঞ্চলে নিরাপত্তা বাড়াতে ভারী যুদ্ধাস্ত্র মোতায়েন করছে ভারত। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ডঃ ইউনুস তার প্রথম চীন সফরের সময় সেভেন সিষ্টার্স নিয়ে মন্তব্যের জেরে ভারতের এই উদ্বেগের কারণ বহুগুণ বেড়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গের এই সুরু প্রসারিত করিডোর উত্তর – পূর্ব রাজ্যগুলোকে ভারতের বাকি অংশের সাথে সংযুক্ত করেছে। এটি নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ এবং চীনের সীমান্তে অবস্থিত। ফলে কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা প্রশ্নঃ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ভারতের।সব দিক বিবেচনায় বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে এই অঞ্চলে একটি শক্তিশালী বিমান বাহিনীর ঘাঁটি এবং আধুনিক রাডার ব্যবস্থা স্থাপন করা সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে ক্ষেত্রে ঠাকুরগাঁও বিমান ঘাঁটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ১৯৪০ সালে বৃটিশ সরকার এই এলাকার কৌশলগত দিক বিবেচনা করে ৫৫০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত ঠাকুরগাঁও বিমান বাহিনী ঘাঁটি। এই বিমান বাহিনীর ঘাঁটিতে বৃটিশরা ৭০ টি বিমান লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছিল প্রাকৃতিক গত ভাবে। কেন বৃটিশরা এই কৌশলগত দিক অবলম্বন করেছিল, প্রশ্ন উঠেছে জনমনে।বিমান ঘাঁটির রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৬ হাজার ফুট, প্রস্থে ৬০০ ফুট। এখানে একটি টার্মিনাল ভবন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।১৯৬৫ সালে ভারত তার রক্ষার স্বার্থে পাক বাহিনীকে পর্যদুস্ত করতে পাশের দেশের বিমান বাহিনী এখানে হামলা চালিয়ে রানওয়ের ব্যাপকভাবে ধ্বংস করে। পরে ১৯৭৭ সালে এর গুরুত্ব বিবেচনা করে সরকার সংস্কার কাজে হাত দেয়। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় ভূমি দস্যু ও সরকারি লিজের কারণে, গুরুত্বপূর্ণ বিমান ঘাঁটিটি সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ঠাকুরগাঁও বিমান ঘাঁটি (IATA:TKR,ICAO:VGSG) বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত একটি বিমান বাহিনীর ঘাঁটি। ঠাকুরগাঁও জেলার শিবগঞ্জের কাছে অবস্থিত। এটি মূলত সরকারি ও সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত একটি Stol (short take – off and landing) বিমান ঘাঁটি ছিল।
ভৌগলিক ও কৌশলগত অবস্থানে এখানে একটি বিমান বাহিনীর ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা বাংলাদেশকে কৌশলগত, সামরিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে উল্লেখযোগ্য ভাবে লাভবান করতে পারে। কি ভৌগলিক সুবিধা পেতে পারে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের উত্তরাংশের এই এলাকা ওপারের চিকেন নেক করিডরের সন্নিকটে অবস্থিত। চিকেন নেক হলো দেশের সীমান্তের ওপারের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগস্থল, যা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই অঞ্চলটির গুরুত্ব অপরিসীম। এর পাশেই রয়েছে ভুটান, নেপাল এবং চীনের মতো দেশ, যা ঠাকুরগাঁওয়ের কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।
ঠাকুরগাঁও বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় এ অঞ্চলে একটি বিমান বাহিনীর ঘাঁটি স্থাপন করলে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার হবে এবং দেশের আকাশ সীমা রক্ষায় আরও কার্যকরী ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত ভাগ করে নেওয়ার কারণে এ ঘাঁটি দ্রুত প্রতিক্রিয়ার জন্য একটি কৌশলগত স্থান হতে পারে। দেশের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
সীমান্ত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে একটি বিমান বাহিনীর ঘাঁটি স্থাপনের মাধ্যমে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতার ক্ষেত্রে উত্তরাঞ্চলে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা বাহিনী নিশ্চিত করতে পারবে।
এয়ার কভারেজ বিস্তৃতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আকাশসীমায় নজরদারির পরিধি বাড়াবে এবং উত্তর- পশ্চিমাঞ্চলের আকাশ সীমা সুরক্ষিত করবে।
বন্যা ও জলাবদ্ধতা থেকে সর্বদা মুক্ত থাকায় বাংলাদেশের দুর্যোগপূর্ণ সময়ে এই বিমান বাহিনীর ঘাঁটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ও ভৌগলিক অবস্থান কারণে এর গুরুত্ব অনুধাবন।
ব্রিটিশরা তাদের সামরিক কৌশলগত লক্ষ্য পূরণের জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঠাকুরগাঁওয়ে একটি বিমানঘাঁটি নির্মাণ করেছিল। এটির মাধ্যমে তারা ওপারের উত্তর-পূর্ব দিককে নিরাপত্তা নিশ্চিত করত এবং সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করত। স্বাধীনতার পর এই ঘাঁটি ব্যবহৃত না হলেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্পষ্ট।
বর্তমান প্রয়োজনীয়তায় ঠাকুরগাঁও বিমান বাহিনীর ঘাঁটি নির্মাণে ভূমিকা।
পাশের লালমনিরহাট বিমান বাহিনীর ঘাঁটি এই অঞ্চলে আকাশসীমা সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও এটি যথেষ্ট নয়। ঠাকুরগাঁওয়ে একটি শক্তিশালী বিমান বাহিনীর ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করলে দেশের উত্তরাঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার হবে। এটি শুধু চিকেন নেকের দিকেই নজর রাখবে না, বরং ভুটান, নেপাল এবং ওপারের সীমান্তবর্তী এলাকায় আকাশসীমার কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করবে।
শক্তিশালী রাডার ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে এর ভূমিকার পর্যালোচনা।
এই অঞ্চলে একটি আধুনিক রাডার ব্যবস্থা স্থাপন অত্যন্ত জরুরি। এটি শুধু আকাশসীমা সুরক্ষাই নয়, বরং সামরিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং প্রতিরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। রাডার ব্যবস্থার মাধ্যমে চীন বা অন্য কোনো দেশের সম্ভাব্য হুমকি আগেভাগেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
উন্নয়ন কৌশল ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ভাববার এখন সময় এসেছে।
ঠাকুরগাঁওয়ে বিমান বাহিনীর ঘাঁটি স্থাপনের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের সামরিক গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাবে। এতে শুধু প্রতিরক্ষা নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তায়ও বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারবে। একই সঙ্গে রাডার ব্যবস্থার সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা গেলে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ হবে।
শুধু প্রতিরক্ষা নয় অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করতে পারে বিমান বাহিনীর ঘাঁটি। যেমন ঘাঁটি স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সাথে সাথে রানওয়ে মেরামত, হ্যাঙ্গার, রাডার ষ্টেশন এবং আবাসন ব্যাবস্থার উন্নয়ন ঠাকুরগাঁওয়ের সামগ্ৰিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
স্থানীয় কর্মসংস্থান, ঘাঁটি ও পরিচালনা সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন খাতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
পর্যটন সম্ভাবনার ক্ষেত্রে সামরিক ঘাঁটি ও সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কাঠামো এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাবে, যা স্থানীয় পর্যটন শিল্পেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
কৌশলগত সামরিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এই বিমান বাহিনীর ঘাঁটির ভূমিকা।
ঠাকুরগাঁওয়ে বিমান বাহিনীর ঘাঁটি স্থাপন বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসাবে সামরিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সহায়ক হতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ, আকাশ পথে অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ এবং শত্রুর আক্রমণের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া জানাতে এটি বিশেষ ভূমিকা পালন করবে।
বহির্বিশ্বে কুটনৈতিক শক্তি উত্তরাঞ্চলে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে। এটি ভারতের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি করতেও সহায়ক হবে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঠাকুরগাঁওয়ে বিমান বাহিনীর ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। ব্রিটিশরা যেভাবে এই অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবন করেছিল, ঠিক সেভাবে বর্তমান বাংলাদেশকেও এই অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। এটি দেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে। তার সাথে ঠাকুরগাঁওয়ের বিমান বাহিনীর ঘাঁটি স্থাপন কেবল সামরিক দিক থেকে নয়, অর্থনৈতিক, ভৌগলিক এবং কৌশলগত দিক থেকেও বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সুবিধা দেবে। এটি দেশের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে এবং উত্তরাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাছাড়া সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে এই গুরুত্বপূর্ণ করিডোরটিকে রক্ষার জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ এই দেশ ভারত। দেশটির চিফ অফ ডিফেন্স ষ্টাফ জেনারেল অনিল চৌহান অপারেশনাল প্রস্তুতি পর্যালোচনা করতে সম্প্রতি উত্তর বঙ্গ পরিদর্শন করেছেন। এসময় তিনি ভারতের আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি ওপর জোর দেন। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক হুমকির বিরুদ্ধে ভারত সজাগ, বাংলাদেশের অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ডঃ ইউনুসের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে নিবিড় ভাবে মূল্যায়ন করেছে ভারত।