
মনিরুজ্জামান মিলন পাটোয়ারী, নীলফামারী
নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের লক্ষীমাড়াই আহাম্মাদিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার কবীর উদ্দীনের বিরুদ্ধে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই সহকারী শিক্ষককে কৌশলে মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও বিদ্যোৎসাহী সদস্য করার অভিযোগ উঠেছে।অভিযোগকারীদের দাবি, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের প্রজ্ঞাপন ও ম্যানেজিং কমিটি গঠন নীতিমালা উপেক্ষা করে নামমাত্র নির্বাচনের মাধ্যমে নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ দাতা সদস্য ও স্থানীয় এলাকাবাসী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), উপজেলা ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, জেলা প্রশাসক, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠন হলেও রহস্যজনক কারণে এবং আর্থিক প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মাদ্রাসার সুপার কবীর উদ্দীনের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, সরকারি বরাদ্দ আত্মসাৎ, শিক্ষা কার্যক্রমে অনিয়ম, নিয়ন্ত্রণহীন পাঠদান, শিক্ষার্থীদের প্রতি অসদাচরণসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে অনেক শিক্ষার্থী টিসি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে গেছে বলেও দাবি করা হয়েছে। জানা যায়, ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত লক্ষীমাড়াই আহাম্মাদিয়া দাখিল মাদ্রাসায় বর্তমানে ১৭ জন, শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২৫০ জন হলেও বাস্তবে উপস্থিতি অত্যন্ত কম বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
গত ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ মাদ্রাসাটির ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ওই কমিটি গঠনে স্বজনপ্রীতি, দাতা সদস্যদের প্রতি বৈষম্য, প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে মামলা, শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদানে অনিয়ম এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাকে সভাপতি ও বিদ্যোৎসাহী সদস্য করা হয়েছে। এছাড়া নিরক্ষর ব্যক্তিদের অভিভাবক সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। দাতা সদস্য মাহবুবুর রহমান মিস্টার বলেন, মাদ্রাসা সুপার কবীর উদ্দীনের ঘনিষ্ঠ ফরহাদ হোসেনের স্ত্রী, লক্ষীমাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা পারভীন আক্তারকে সভাপতি এবং রাজবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আরিফ হোসেনকে বিদ্যোৎসাহী সদস্য করা হয়েছে। এটি ম্যানেজিং কমিটি গঠনের নীতিমালার পরিপন্থী।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আমরা বিষয়টি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে লিখিতভাবে জানাই। তিন কার্যদিবসের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও সুপার কৌশল ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তদন্তে বাধা সৃষ্টি করেছেন।প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের প্রতিবাদ করায় আমাদের নামে মামলা করা হয়েছে। এমনকি মীমাংসার কথা বলে আমাকে নীলফামারীতে ডেকে নিয়ে ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে।
তিনি অবিলম্বে সুপার কবীর উদ্দীনের অপসারণ, বর্তমান ম্যানেজিং কমিটি বিলুপ্ত এবং ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে উৎসবমুখর পরিবেশে সকল দাতা সদস্য, অভিভাবক ও স্থানীয়দের অংশগ্রহণে নতুন নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানান। এ বিষয়ে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও লক্ষীমাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা পারভীন আক্তার গণমাধ্যমকে বলেন, “আমি সভাপতি হতে আগ্রহী ছিলাম না। তবে প্রতিষ্ঠানের সুপার কবীর উদ্দীন আমার আত্মীয় (অখিল বাবা) হওয়ায় এবং আমার স্বামী ফরহাদ হোসেনের অনুরোধে আমি সভাপতি হয়েছি।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হওয়া নিয়মসঙ্গত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব বিষয় আমাকে সুপার জানাননি। অন্যদিকে বিদ্যোৎসাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী রাজবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আরিফ হোসেন মুঠোফোনে বলেন, যথাযথ নিয়মকানুন মেনেই আমি বিদ্যোৎসাহী সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। আপনার আরও কিছু জানার থাকলে সরাসরি সাক্ষাৎ করে কথা বলুন। এরপর তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। অভিযোগের বিষয়ে লক্ষীমাড়াই আহাম্মাদিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার কবীর উদ্দীন বলেন, ম্যানেজিং কমিটি নির্বাচন নীতিমালার বই আমি সঙ্গে নিয়ে চলি। আমাকে নিয়ম শেখানোর প্রয়োজন নেই। যথাযথ নিয়ম মেনেই কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির কিছুই করতে পারবেন না। এদিকে বাংলাদেশ সরকারের প্রচলিত নির্বাচন বিধি ও গেজেট অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে কর্মরত কোনো শিক্ষক বেসরকারি মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বা বিদ্যোৎসাহী সদস্য হিসেবে মনোনীত হতে পারেন না। বিশেষ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতীত এ ধরনের মনোনয়ন বিধিবহির্ভূত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুস সামাদ বলেন, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার অনুমতি সাপেক্ষে এ ধরনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। তবে এ কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ পেয়েছি। আমরা তিন কার্যদিবসের মধ্যে জবাব চেয়েছিলাম। কিন্তু সুপার এক সপ্তাহ সময় নিয়েছেন। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আশরাফুজ্জামান বলেন, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার অনুমতি সাপেক্ষে কিছু বিষয় বিবেচিত হতে পারে। তবে নবম গ্রেডের নিচে কর্মরত কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বা অন্য কোনো পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ নেই। যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।