
মোঃ আব্দুল আজিজ শেখ,
নওগাঁ প্রতিনিধি:
নওগাঁর ধামইরহাটে হালিমা বেগম (৬৫) নামে এক নিঃসন্তান নারীর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে জেলা পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই, ভাবীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, স্বর্ণালঙ্কার, জমিজমা ও গবাদিপশু নিয়ে বিরোধ এবং ব্যক্তিগত আক্রোশের জেরে পরিকল্পিতভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়। ঘটনার এক দিনের মধ্যেই অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রশি এবং ওড়না উদ্ধার করা হয়েছে।
গত ১৯ অক্টোবর সকালে ধামইরহাট উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের ছিলিমপুর (তালবোনা) গ্রামের একটি বাঁশঝাড়ের পাশে ধানখেতের আইলে হালিমা বেগমের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন নিহতের ছোট ভাই মজনু রহমান (৫৬), তাঁর স্ত্রী হোসনে আরা বেগম (৪২), আলমপুর ইউনিয়নের বস্তাবর গ্রামের রবিউল ইসলাম (৩৯) এবং ছিলিমপুর গ্রামের হামিদুর রহমান (৫৫) ও মোশারফ হোসেন (৪৫)।
পুলিশ জানায়, হালিমা বেগম নিঃসন্তান ও স্বামী পরিত্যক্তা ছিলেন। প্রায় ২০ বছর ধরে বাবার বাড়ির ভিটায় একটি একচালা ঘরে বসবাস করতেন তিনি। হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগল পালন এবং অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। নিজের জমানো টাকা ছোট ভাই মজনুর কাছে না রেখে ভাতিজা রুবেলের কাছে জমা রাখতেন। এ নিয়ে মজনু ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে হালিমার বিরোধ ছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।
এ ছাড়া নিহতের স্বর্ণালঙ্কার, জমিজমা ও গবাদিপশু নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বিরোধ ও আক্রোশ থেকেই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয়।
ঘটনার খবর পেয়ে নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের নির্দেশনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পত্নীতলা সার্কেল) মো. শরিফুল ইসলাম ও ধামইরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিন্টু রহমান ঘটনাস্থলে যান। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদনে নিহতের এক কানের লতি কাটা এবং অন্য কানের লতি ছেঁড়া অবস্থায় পাওয়া যায়। এ ঘটনায় ১৯ অক্টোবর ধামইরহাট থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করা হয়।
পরে পুলিশ সুপারের তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হয়। স্থানীয় গোয়েন্দা তথ্য ও বিভিন্ন উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ওই রাতেই আলমপুর ইউনিয়নে অভিযান চালিয়ে প্রথমে মজনু রহমান ও তাঁর স্ত্রী হোসনে আরাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রবিউল ইসলাম, হামিদুর রহমান ও মোশারফ হোসেনকে নিজ নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানান, হত্যাকাণ্ডের প্রায় পাঁচ দিন আগে তাঁরা এ পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৮ অক্টোবর রাত সাড়ে ১১টার দিকে হামিদুর রহমান হালিমাকে ঘর থেকে ডেকে বের করেন। এরপর তাঁকে ধরে প্রায় ২০০ গজ দূরে একটি খড়ের পালার পেছনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রশি দিয়ে তাঁর হাত বেঁধে এবং ওড়না দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশ আরও জানায়, হত্যার পর হালিমার কানের স্বর্ণের দুল নেওয়ার জন্য তাঁর এক কানের লতি কেটে এবং অন্য কানের লতি ছিঁড়ে ফেলা হয়। পরে মরদেহটি বাঁশঝাড়ের ওপারে ধানখেতের আইলে ফেলে রাখা হয়। স্বর্ণালঙ্কারের অংশ ভাগ করে নেওয়ার তথ্যও তদন্তে পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রশি ও ওড়না উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
নওগাঁ জেলার পুলিশ সুপার জানিয়েছে, জেলায় অপরাধ দমন ও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।