
সুমন খান:
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) উত্তরা মেট্রো-৩ কার্যালয়ের রেজিস্ট্রেশন (প্রাইভেট) শাখাকে ঘিরে ঘুষ লেনদেন, দালাল সিন্ডিকেট, ফাইল নিষ্পত্তিতে অনিয়ম এবং সেবাপ্রার্থীদের হয়রানির একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) বশির উদ্দিন আহমেদ এবং মোটরযান পরিদর্শক কাউসার আলম।সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, গাড়ির মালিকানা পরিবর্তন, রেজিস্ট্রেশন, নাম সংশোধন ও অন্যান্য দাপ্তরিক কাজকে কেন্দ্র করে একটি দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে। সরকারি নির্ধারিত ফি জমা দেওয়ার পরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নির্দিষ্ট কিছু মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে কাজ করালে দ্রুত নিষ্পত্তির আশ্বাস দেওয়া হয়। অন্যদিকে, অতিরিক্ত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফাইল আটকে রাখা কিংবা দিনের পর দিন ঘোরানোর অভিযোগও রয়েছে।তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন।মালিকানা পরিবর্তনে ৩০ হাজার টাকা দাবির অভিযোগ
গাড়ির মালিকানা পরিবর্তনের মতো নিয়মিত সরকারি সেবা নিতে গিয়েও অতিরিক্ত অর্থ দাবির অভিযোগ করেছেন গাজীপুর থেকে আসা আনোয়ার হোসেন নামের এক সেবাপ্রার্থী।তার অভিযোগ, প্রাইভেটকারের মালিকানা পরি বর্তনের জন্য বিআরটিএ মেট্রো-৩ কার্যালয়ে গেলে দালালের মাধ্যমে তার কাছে ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। তিনি কম টাকা দেওয়ার কথা বললেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা রাজি হননি বলে দাবি করেন তিনি।আনোয়ার হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি সেবা নিতে এসে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ায় তিনি অসহায় বোধ করেন।এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট ফাইল, সরকারি ফি জমার রসিদ, অর্থ দাবির কোনো প্রমাণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য পরীক্ষা করা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।দালাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সামনে আসছে কয়েকটি নাম,বিআরটিএ কার্যালয়কে ঘিরে দালালদের তৎপরতা নিয়ে একাধিক সেবাপ্রার্থী অভিযোগ করেছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কিছু ব্যক্তি নিজেদের দাপ্তরিক কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা দাবি করেন।অভিযোগে দুলাল, হানিফ, সোহেল, জীবন, সবুর ও জিকো নামের কয়েকজন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব ব্যক্তির মাধ্যমে অর্থ লেনদেন এবং বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করার আশ্বাস দেওয়া হয়।তবে উল্লিখিত ব্যক্তিদের প্রত্যেকের ভূমিকা, অর্থ লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সঙ্গে তাদের যোগসাজশ রয়েছে কি না, তা এখনো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।প্রশ্ন উঠেছে, কার্যালয়ের ভেতরে-বাইরে যদি এমন কোনো চক্র সক্রিয় থাকে, তাহলে তাদের শনাক্ত করতে নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর ব্যবস্থা কতটা নেওয়া হচ্ছে?দালালবিরোধী অভিযান, তবু অভিযোগের অবসান হচ্ছে না কেন?বিআরটিএর বিভিন্ন কার্যালয়ে দালালবিরোধী অভিযান পরিচালনার খবর পাওয়া যায়। তবে অভিযোগ কারীদের প্রশ্ন, এসব অভিযানে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকজনকে আটক বা শাস্তি দেওয়া হলেও দালালচক্রের মূল হোতাদের শনাক্ত করা হচ্ছে কি না। কয়েকজন অভিযোগকারীর দাবি, অভিযান চলাকালে দালালদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগও রয়েছে। তাদের ভাষ্য, কিছু ব্যক্তি আগাম খবর পেয়ে সরে যাওয়ার সুযোগ পান। তবে এ অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি, ফোনকলের তথ্য কিংবা স্বাধীন সাক্ষ্য পাওয়া গেলে তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে।এখানে মূল প্রশ্ন হলো অভিযানে আটক ব্যক্তিরা কি কেবল মধ্যস্থতাকারী, নাকি তাদের পেছনে আরও প্রভাবশালী কোনো নেটওয়ার্ক রয়েছে? অর্থ লেনদেনের প্রকৃত সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করা ছাড়া অনিয়মের অভিযোগের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।একাধিক অভিযোগের পরও ব্যবস্থা নেই কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ,সহকারী পরিচালক বশির উদ্দিন আহমেদ এবং মোটরযান পরিদর্শক কাউসার আলমকে ঘিরে আগেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু এসব অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো বিভাগীয় তদন্ত হয়েছে কি না, তদন্ত হয়ে থাকলে তার ফল কী এবং কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।
অভিযোগ প্রকাশিত হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। তবে একই ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে এলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা নেওয়া।বিআরটিএর চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে তাই কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ?বশির উদ্দিন আহমেদ ও কাউসার আলমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো যাচাইয়ে কোনো তদন্ত হয়েছে কি?কার্যালয়ের আশপাশে সক্রিয় কথিত দালালদের তালিকা ও পরিচয় যাচাই করা হয়েছে কি?সরকারি ফি ছাড়া অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্তে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সঙ্গে দালালদের যোগসাজশের প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?অভিযোগকারীদের নিরাপত্তা ও হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ রয়েছে কি?এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।অসহায় সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি
বিআরটিএর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সেবা নিতে আসেন। কেউ গাড়ির মালিকানা পরিবর্তন করতে, কেউ রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতে, আবার কেউ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংশোধন করতে আসেন।
অভিযোগ রয়েছে, এসব কাজের সুযোগ নিয়ে কোনো কোনো মধ্যস্থতাকারী সেবাপ্রার্থীদের কাছে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেন। কেউ দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার আশ্বাস দেন, আবার কেউ জটিলতা তৈরির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগকারীদের বক্তব্য।
বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষ সরকারি ফি পরিশোধের পরও অতিরিক্ত অর্থের চাপ সামলাতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।একজন সেবাপ্রার্থীর জন্য সরকারি কার্যালয়ে যাওয়া মানেই যেন হয়রানি, দালালের খোঁজ এবং অতিরিক্ত অর্থের অনিশ্চয়তা এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তা শুধু ব্যক্তিগত অনিয়ম নয়, বরং সরকারি সেবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জন্যও উদ্বেগের বিষয়।সম্পদের উৎস নিয়েও অভিযোগ, প্রয়োজন অনুসন্ধানের,সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জীবনযাপন ও সম্পদের উৎস নিয়েও কিছু অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, চাকরি থেকে প্রাপ্ত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান হওয়া প্রয়োজন।তবে কারও সম্পদ, ফ্ল্যাট, জমি বা জীবনযাপন নিয়ে অভিযোগ ওঠা আর অবৈধ সম্পদ অর্জন প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। এ ক্ষেত্রে সম্পদের বিবরণ, আয়কর নথি, বৈধ আয়ের উৎস এবং প্রাসঙ্গিক আর্থিক তথ্য যাচাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।যদি সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণে অস্বাভাবিক সম্পদের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তাহলে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আইনানুগ অনুসন্ধান হতে পারে যথাযথ পদক্ষেপ।বক্তব্য ও নথিপত্র যাচাই জরুরি বশির উদ্দিন আহমেদ ও কাউসার আলমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগকারীদের বক্তব্য, সরকারি নথি, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ, দালালবিরোধী অভিযানের রেকর্ড এবং প্রযোজ্য বিধিমালা যাচাই করা প্রয়োজন।প্রতিবেদন প্রকাশের আগে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তার বক্তব্য সরাসরি নিতে হবে। যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য পাওয়া না গেলে কখন, কীভাবে যোগাযোগ করা হয়েছে, তা উল্লেখ করা যেতে পারে। এ ছাড়া বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও যুক্ত করা প্রয়োজন। তদন্ত হোক, বেরিয়ে আসুক প্রকৃত চিত্র,বিআরটিএর মতো জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে সাধারণ মানুষের জন্য নির্ধারিত সেবা সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত হওয়া অপরিহার্য। সেখানে ঘুষ লেনদেন, দালালচক্রের প্রভাব কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।বশির উদ্দিন আহমেদ ও কাউসার আলমকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, কথিত দালালচক্রের পরিচয় শনাক্ত, অর্থ লেনদেনের তথ্য যাচাই এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।প্রশ্ন একটাই বিআরটিএ মেট্রো-৩ কার্যালয়ে অনিয়মের অভিযোগের প্রকৃত চিত্র কী? কারা এর সঙ্গে জড়িত, আর কারা নির্দোষ?
অনুমান কিংবা পাল্টাপাল্টি বক্তব্য নয়; প্রয়োজন তথ্য-প্রমাণভিত্তিক তদন্ত, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। সরকারি সেবা যেন কোনো মধ্যস্থতাকারীর কাছে জিম্মি না হয় ,এটাই সেবাপ্রার্থীদের প্রত্যাশা।