
নিজেস্ব প্রতিবেদক:
শরীয়তপুরের জাজিরায় নেশাগ্রস্ত থাকা অবস্থায় মোনছের মাল (৩৩) নামে এক মাতাল’কে ধরে চোর সাজিয়ে কয়েক দফা গণধোলাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। গণধোলাইয়ের ঘটনায় মামলা নেয়ায় পুলিশের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ভিত্তিহীন অপবাদ রটাচ্ছে ঘটনায় জড়িতরা।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ভুক্তভোগী মোনছের মাল বাউল ভক্ত। বিভিন্ন মাজারে মাজারে ঘুরে বেড়ান তিনি। ঘটনার দিন তিনি পালের চর এলাকায় গান শুনতে যান। গান শুনে আসার আগে বাউল ভক্ত মোনছের ও তার একাধিক বন্ধু মিলে কল্কিতে গাঁজা সেবন করেন। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় থাকায় নিজের বাড়ি চিনতে ভুল করেন তিনি। ভুলবশত মামলার বিবাদী রাশিদা বেগমের বাড়িতে গিয়ে দরজা খুলতে বলেন মোনছের। এতেই বাঁধে বিপত্তি। চোর ভেবে চিৎকার দেন রাশিদা বেগম। এসময় মোনছের পালিয়ে না গিয়ে তাদের বুঝানোর চেষ্টা করেন, চোর নয় ভুলবশত এই বাড়িতে এসেছেন তিনি।
তবে অতিউৎসাহী কিছু লোক মোনছেরের কথা না শুনে মধ্যযুগীয় কায়দায় কয়েক দফা গণধোলাই দেয় তাকে । গুরুতর আহতাবস্থায় সারারাত গাছের সাথে বেঁধে নির্যাতন চালায় মোনছেরের উপর । এতে মোনছের একটি পা, একটি হাত ও বুকের হাড় ভেঙে যায়। গুরুতর আহত মোনছেরকে উদ্ধার করে প্রথমে জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর নির্দেশ দেন কর্তব্যরত চিকিৎসকরা। ঘটনার পরপরই আহত মোনছের মালের ভাই সানু মাল বাদী হয়ে জাজিরা থানায় এসে ১৫’জনের নাম উল্লেখ করে ও ১০-১২ জনকে অজ্ঞাত উল্লেখ করে মামলা করেন।
এদিকে গণধোলাইয়ের ঘটনায় মামলা গ্রহন করায় পুলিশের উপর ক্ষিপ্ত হয়েছে জড়িতরা। তাদের দাবি জড়িত নয় এমন ব্যাক্তিদের নাম এসেছে মামলায়। এর পিছনে হাত রয়েছে পুলিশের। শুধু তাই নয়, জামিনে আসা আসামীদের হয়রানি করা হচ্ছে। এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকা নিয়েছে বলেও ভিত্তিহীন অপবাদ দিচ্ছেন কেউ কেউ। তবে এর কোনো প্রমাণ নেই তাদের কাছে। জামিনে আসা কোনো ব্যাক্তিদের পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে কেউ কেউ বলেন, ‘আমরা পুলিশ দেখেই পালিয়ে গেছি, থাকলে হয়তো ধরতো’ পুলিশ বাসায় এসে আইডি কার্ড ও মোবাইল নাম্বার চেয়েছে, এগুলো হয়রানি বলে মনে করছেন তারা।
মামলার ৮-নং আসামী সিরাজ মুন্সির ছেলে মেছের মুন্সি (২৬) জানান, পুলিশ তাদের ব্যাপক হয়রানি করেছে। ঘটনায় সে জড়িত না থাকলেও তাকে আসামী করা হয়েছে মামলায়। তবে পুলিশ তার কাছে কোনো টাকাপয়সা চায়নি। ঠিক কি ধরনের হয়রানি করেছে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আমাদের বাড়িতে গিয়েছে এবং আমার আইডি কার্ড ও মোবাইল নাম্বারও চেয়েছে।
এছাড়া মামলার ১২-নং আসামী মাস্টার আলী আকবর মুন্সির ছেলে ইকবাল হোসেন বলেন, মামলার বাকি ১৪ জন আসামীর থেকেও আমার ক্ষতি হয়েছে বেশি। তবে পুলিশের সাথে আমার দেখা হয়নি। আমি জামিনে আছি। পুলিশ আমার থেকে কোনো টাকাপয়সা চায়নি এবং আমিও দেইনি। কি ক্ষতি হয়েছে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, বাড়িতে না থাকার ফলে ফসলের যত্ন নিতে পারিনি। এইজন্য ফসল নষ্ট হয়েছে।
স্থানীয় তৈয়ব আলী মোল্লার ছেলে সিরাজ মোল্লা (৫৫) জানান, সন্দেভাজনদের তালিকায় বাদী তার নাম কাগজে লিখেছিলো। পুলিশ এসে আমাকে দেখেছে। আমি তাকে বলছি আমি অসুস্থ এবং ঘটনায় জড়িত নই। পুলিশ খুবই ভালো মানুষ। আমার কথা শুনে সে আমাকে বলেছে ‘কাকা আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে না আপনি জড়িত, আপনি বাসায় যান, আপনাকে কেউ ধরবে না।
এছাড়াও মামলার একাধিক আসামীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা কেউ টাকা দেয়নি। তবে প্রবাসে থাকা ব্যাক্তিদের নাম আসামীর তালিকায় দেখে ক্ষিপ্ত হয়েছে অনেকেই।
মামলার ১-নং আসামি গিয়াস উদ্দিন মাঝী (৫০) এর সাথে কথা বলতে গেলে, তিনি গরু ছুটে গেছে বলে বাসা থেকে চলে যান। এরপর প্রায় ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করেও তাকে আর পাওয়া যায়নি।
এই বিষয়ে জাজিরা থানার পুলিশের উপপরিদর্শক ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম বলেন, আমি এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। মামলার তদন্তের স্বার্থে আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছি। সঠিক তথ্য নিশ্চিত করতে একাধিক ব্যাক্তিকে জিজ্ঞাবাদ করেছি। আসামীদের নাম-ঠিকানা ও বয়স যাচাই করতে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র চেয়েছি। জামিনে আসা কোনো ব্যাক্তিকে আমি গ্রেপ্তার করিনি। এছাড়া ঘটনাস্থলে গিয়ে আমি মৌখিক ভাবে শুনেছি যে, এমন একজন ব্যাক্তিকে আসামি করা হয়েছে, সে বিদেশে থাকেন। আমি তার বিদেশ যাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করতে পাসপোর্ট এর ছবি সহ পর্যাপ্ত কাগজপত্র নিয়ে দেখা করতে বলেছি। এইজন্য কারোর থেকে কোনো টাকাপয়সা বা সুযোগ-সুবিধা আমি গ্রহণ করিনি।
হয়রানি বলতে তারা ঠিক কি বুঝিয়েছে আমি জানি না। মামলায় জামিন হলেই মামলা মামলার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়না। আসামীদের পরিচয় যাচাই এবং ঘটনার সঠিক তথ্য নিশ্চিত করে প্রতিবেদন দিতে বাদী, বিবাদী এবং স্থানীয়দের সাথে আমাদের কথা বলতে হয়। এই বিষয় গুলো হয়রানি নয়, এগুলো পুলিশের দায়িত্ব।