
বিশেষ প্রতিনিধি;
এক সাথে মাদক গ্রহণ, দলবদ্ধ হয়ে গণধর্ষণ অতঃপর নিজেরা বাঁচতে শ্বাসরুদ্ধ করে তরুণীকে হত্যা। এমন শ্বাসরুদ্ধকর জবানবন্দী দিয়েছে আরেক হত্যা মামলার গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা। এই জবানবন্দীর ওপর ভিত্তি করে পুলিশ খুঁজে পায় এক বছর আগের অজ্ঞাতনামা তরুণী হত্যা মামলার রহস্য। অতঃপর উন্মোচন হয় সেই অজ্ঞাতনামা নারীর হত্যার রহস্য।
সেই হত্যা মামলার প্রধান আসামি শাওন (২৫)-কে ঘটনার এক বছর পর শরিয়তপুর জেলার জাজিরা থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে কেরানীগঞ্জ মডেল থানা পুলিশ।
মঙ্গলবার দুপুরে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিশ্চিত করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম (ক্রাইম, অপস্ অ্যান্ড ট্রাফিক-দক্ষিণ)।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে একই বাসায় ভাড়া থাকতেন দুই বান্ধবী বৃষ্টি ও মারিয়া। ঘটনার দিন অর্থাৎ ২০২২ সালের ৬ জুন প্রেমিক রাকিবের সাথে ঘুরতে বের হয়েছিল কিশোরী প্রেমিকা বৃষ্টি (১৬) ও তার বান্ধবী মরিয়া (১৬)।
ঘুরাঘুরির এক পর্যায়ে তারা চলে আসে কেরানীগঞ্জের খোলামোড়া টিনের মসজিদ এলাকার শিয়ালের গাড়া নামক দেয়াল বেষ্টিত জঙ্গলে। সেখানে একসাথে চলে মাদক সেবন, সাথে যুক্ত হয় শাওনের বন্ধু আলি আকবর, রিয়াজ ও সজিব। মাদক সেবনের এক পর্যায়ে বৃষ্টি ও রাকিব এক অপরের সম্মতিতে মেলা মেশা করলে তাদের নজর পড়ে ১৬ বছরের কিশোরী মারিয়ার দিকে। এ সময় বৃষ্টিকে কৌশলে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয় ধর্ষকরা।
প্রথমে মারিয়াকে ধর্ষকরা কুপ্রস্তাব দেয়। মারিয়া এতে সাড়া না দিলে শাওন, সজিব, আলি আকবর ও রিয়াজ তাকে জোরপূর্বক পালাক্রমে ধর্ষণ করে। মারিয়া এই ধর্ষণের কথা পুলিশের কাছে জানিয়ে দিবে বললে ধর্ষকরা সবাই মিলে নিজেরা বাঁচতে মারিয়ার গলার ওড়না দিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে। পরে মারিয়ার লাশ গুমের উদ্দেশে ভাসিয়ে দেওয়া হয় বামনশুর মসজিদের পুকুরে।
এরপর অজ্ঞাতনামা হিসেবে মারিয়ার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ বাদী হয়ে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করে। পরবর্তীতে মামলাটি অতীব গুরুত্ব বিবেচনায় পিবিআই-এর হাতে হস্তান্তর করা হয়। পিবিআই এই মামলার এক বছরের অধিক সময় তদন্ত করার পরেও কোনো রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি।
অন্যদিকে চলতি মাসেই অটো চালক নয়ন হত্যা মামলার তদন্ত ও এ মামলার আাসামি সজিব, আলী আকবার, রাকিব, রিয়াজ নামে ৪ আসামিকে গ্রেপ্তার করার মাধ্যমেই কাকতালীয়ভাবে মারিয়া হত্যার মূল রহস্য বেরিয়ে আসে।
ওই চার আসামি নয়ন হত্যার পাশাপাশি মারিয়াকেও গণধর্ষণ করে হত্যার পর লাশ গুম করার উদ্দেশে একটি পুকুরে ফেলে দেওয়ার লোমহর্ষক বর্ণনা দেয় পুলিশের কাছে। গ্রেপ্তার হওয়া সকল আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা, মাদকসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
এ অবস্থায় উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে মারিয়া হত্যা মামলাটি পিবিআই ঢাকা জেলা থেকে আবার কেরাণীগঞ্জ মডেল থানার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এরপর ঢাকার পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান শাওনকে গ্রেপ্তারের জন্য তাৎক্ষনিক নির্দেশ দেন। এরই ধারাবাহিকতায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস্ অ্যান্ড ট্রাফিক-দক্ষিণ) আমিনুল ইসলামের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং কেরাণীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহাবুদ্দিন কবীরের নির্দেশনায় মামলার তদন্তকারী অফিসার অলক কুমার দের নেতৃত্বে এসআই রিয়াজ ও এএসআই আলামিন সহ কেরানীগঞ্জ মডেল থানার একটি চৌকস আভিযানিক দল চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার মূল হোতা শাওনকে তথ্য-প্রযুক্তির সহযোগিতায় শরীয়তপুরের জাজিরা থেকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
মারিয়া হত্যা মালার প্রধান আসামি শাওনকে আদালতের পাঠানো হয়েছে এবং এ মামলার অন্যান্য আসামি আগেই নয়ন হত্যা মামলায় আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম। অতিদ্রুত সময়ের মধ্যে পুলিশ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।
সংবাদ সম্মপলনে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কেরানীগঞ্জ সার্কেল শাহাবুদ্দিন কবির সাহাব, পরিদর্শক (তদন্ত) খালেদুর রহমান, পরিদর্শক (অপারেশন) আশিকুর রহমান, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অলক কুমার দে, এ এস আই আলামিন প্রমুখ।