
নিজস্ব প্রতিবেদক,
শাহেদ আহমেদ
“অটিজম কোনো সীমাবদ্ধতা নয় — প্রতিটি জীবন মূল্যবান” এই মানবিক ও সচেতনতামূলক প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সাতক্ষীরায় বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস-২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে এক বর্ণাঢ্য আলোচনা সভা ও সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে সমাজে অটিজম সম্পর্কে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং তাদের প্রতি সহমর্মিতা বৃদ্ধির আহ্বান জানানো হয়।
বুধবার (১৩ মে) সকালে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসন ও জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের যৌথ আয়োজনে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাস্থলজুড়ে ছিল সচেতনতামূলক ব্যানার, ফেস্টুন ও অটিজম বিষয়ক বিভিন্ন তথ্যচিত্র। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষক, চিকিৎসক, সমাজকর্মী, অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিজ্ কাউসার আজিজ। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, অটিজম কোনো রোগ নয়, এটি একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। সমাজে সচেতনতার অভাব, কুসংস্কার ও অবহেলার কারণে অটিজমে আক্রান্ত শিশু ও তাদের পরিবারকে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। তিনি বলেন, “বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ, সঠিক পরিচর্যা, উন্নত শিক্ষা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা গেলে তারাও সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধী ও অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুদের উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, ভাতা, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে তাদের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সমাজের প্রতিটি মানুষকে এ বিষয়ে আরও সংবেদনশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক সাইদুর রহমান মৃধার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের আমির উপাধ্যক্ষ শহিদুল ইসলাম মুকুল, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) শাহিনুর রহমান চৌধুরী।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শহিদুল ইসলাম মুকুল বলেন, “অটিজম সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে সমাজের সকল স্তরের মানুষকে একযোগে কাজ করতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “অটিজম কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়; বরং সঠিক শিক্ষা, যত্ন, ভালোবাসা ও সহযোগিতা পেলে এসব শিশুরা ভবিষ্যতে দেশ ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।”
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহিনুর রহমান চৌধুরী বলেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নিরাপত্তা, মানসিক বিকাশ এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও আন্তরিকভাবে কাজ করছে। তিনি সমাজে বৈষম্য ও অবহেলা দূর করে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় বক্তারা বলেন, অটিজম সম্পর্কে এখনো গ্রামাঞ্চলে পর্যাপ্ত সচেতনতা তৈরি হয়নি। অনেক পরিবার লজ্জা, ভয় বা সামাজিক কুসংস্কারের কারণে শিশুদের চিকিৎসা ও বিশেষ প্রশিক্ষণ থেকে দূরে রাখেন। ফলে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে গণসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ এবং পরিবারভিত্তিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি বলে মত দেন বক্তারা।
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী অভিভাবকরাও তাদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, সমাজের সহমর্মিতা ও ইতিবাচক আচরণ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে তারা সরকারি সহায়তা আরও বাড়ানোর দাবি জানান।
আলোচনা সভা শেষে অটিজম সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয় এবং ভবিষ্যতে স্কুল-কলেজ ও সামাজিক পর্যায়ে আরও বেশি সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।
সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোঃ রোকনুজ্জামান।