
নিজস্ব প্রতিবেদক :
এই আসামিদের যদি ধরা না হয়, তবে সবাইকে সাক্ষী রেখে বলছি—হয় আমাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে, না হয় তাদের চেয়ে বড় সন্ত্রাসী হতে হবে। এই সিদ্ধান্তটা এখন আপনাদের নিতে হবে।’
প্রায় ১১ মাস আগে নেত্রকোনার তৎকালীন পুলিশ সুপারের সামনে নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে এমনই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের হাতে হত্যার আশঙ্কা জানিয়ে নিরাপত্তাও চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গুলিতে প্রাণ হারাতে হয়েছে তাকে।
গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার উতরাইল বাজার এলাকায় গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক আলিফ। তার মৃত্যুর পর ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর তৎকালীন পুলিশ সুপার মো. তারিকুল ইসলামের সঙ্গে সাংবাদিকদের পরিচিতি ও মতবিনিময় সভায় দেওয়া বক্তব্যটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ১৭ অক্টোবর সকাল থেকে বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
আগেই জানিয়েছিলেন প্রাণনাশের আশঙ্কা
২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ওই সভায় আলিফ নিজের সাংবাদিকতার কাজের ধরন এবং ঝুঁকির কথা তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সংঘবদ্ধ অপরাধ, মাদক ও অস্ত্রধারী চক্রের কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করতেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলার কিছু এলাকায় চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় ছিল, যাদের কাছে অস্ত্র ও বিস্ফোরক থাকার অভিযোগও ছিল।
সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময়ও তার কাছে বার্তা আসছিল বলে তিনি জানিয়েছিলেন। তার আশঙ্কা ছিল, সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা সভার বাইরে অপেক্ষা করছে এবং সভা শেষে বের হলে তাকে গুলি করা হতে পারে। বাড়ির আশপাশেও অস্ত্রধারীরা ওঁৎ পেতে রয়েছে বলে খবর পেয়েছিলেন তিনি। এ কারণে সেদিন সভা শেষে বাড়িতে না ফেরার কথাও জানিয়েছিলেন সাংবাদিক আলিফ।
নিজের নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে তিনি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। পরে তিনি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মৃত্যুর পর সামনে আসছে নিরাপত্তার প্রশ্ন
আলিফের মৃত্যুর পর এখন সামনে এসেছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রাণনাশের আশঙ্কা প্রকাশ্যে জানানোর পর তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল? তিনি যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন, তাদের বিষয়ে কী ধরনের তদন্ত বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? তার করা সাধারণ ডায়েরির ভিত্তিতে পুলিশ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য, সাধারণ ডায়েরির নথি এবং তদন্তের অগ্রগতি যাচাই করা প্রয়োজন।
একজন সাংবাদিকের কাজের কারণে যদি তার জীবন হুমকির মুখে পড়ে, তাহলে অভিযোগ পাওয়ার পর ঝুঁকি মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আলিফের আগের বক্তব্য ও পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
বিচার ও জবাবদিহির দাবি
সাংবাদিক আলিফের আগে থেকে প্রকাশ করা আশঙ্কা এবং পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠছে। তার অভিযোগের বিষয়ে তৎকালীন পুলিশ প্রশাসন কী করেছিল, তা জনসমক্ষে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং ঘটনার পেছনের কারণ উদ্ঘাটন জরুরি।
প্রাণনাশের আশঙ্কা জানানোর প্রায় ১১ মাস পর একজন সাংবাদিকের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি অভিযোগ পাওয়ার পর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আগেই বিপদের আশঙ্কা জানানো সাংবাদিক আলিফকে নিরাপদ রাখতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, আর তার মৃত্যুর জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করতে তদন্ত কত দূর এগিয়েছে? এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর মিলবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, নথিপত্র ও তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে।