
শাহেদ আহমেদ
ঘেরমালিক বিশ্বনাথ ঘোষসহ ১৫–২০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, লোহার রড, হাতুড়ি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলার দাবি; হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু শাহেদ আহমেদ, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় মাছ চুরির অভিযোগে ক্ষিতিশ চন্দ্র মণ্ডল (৫৫) নামে এক মৎস্যজীবীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাত ৩টার দিকে উপজেলার জেয়ালা উত্তরখোলা বিলের একটি মাছের ঘেরে এ ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার বেলা ১২টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ঘেরমালিক বিশ্বনাথ ঘোষ, তাঁর ঘেরের কর্মচারী গফ্ফার, শিমুল ঘোষ, হাবিবুর গাজী, ইব্রাহিম খাঁ, সমর ঘোষসহ ১৫–২০ জনের বিরুদ্ধে মারধর ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে জখম করার অভিযোগ করেছেন নিহতের স্ত্রী সুলেখা মণ্ডল। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং মামলা দায়েরের বিষয়টিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মাছ চুরির অভিযোগে আটক, এরপর মারধর: নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার ভোররাতে জেয়ালা উত্তরখোলা সরকারি বিলের বিশ্বনাথ ঘোষের মাছের ঘের থেকে ক্ষিতিশ চন্দ্র মণ্ডলকে আটক করা হয়। এ সময় ঘেরের কর্মচারী গফ্ফার, ঘেরমালিক বিশ্বনাথ ঘোষ, শিমুল ঘোষ, হাবিবুর গাজী, ইব্রাহিম খাঁ, সমর ঘোষসহ ১৫–২০ জন তাঁকে সংঘবদ্ধভাবে মারধর করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নিহতের পরিবারের দাবি, মারধরের একপর্যায়ে ক্ষিতিশের মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়। এ ছাড়া লোহার রড ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে তাঁর হাত-পা ভেঙে দেওয়া হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। মাছ চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে কী পরিস্থিতিতে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। স্বামীকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করেন স্ত্রী: স্বামীর ওপর হামলার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান সুলেখা মণ্ডল। সেখানে গিয়ে তিনি স্বামীকে গুরুতর আহত অবস্থায় দেখতে পান। পরে প্রতিবেশীদের সহায়তায় তাঁকে উদ্ধার করে তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। নিহতের স্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, গুরুতর আহত হওয়ার পরও ক্ষিতিশ তখন কথা বলতে পারছিলেন। তিনি স্ত্রীকে হামলার ঘটনা সম্পর্কে জানান এবং কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন। কিন্তু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়। স্বামীকে হারিয়ে শোকাহত সুলেখা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। মাথায় ধারালো দা দিয়ে চারটি কোপ দেওয়ার অভিযোগ: প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে পার্থ মণ্ডল, প্রকাশ মণ্ডলসহ স্থানীয় কয়েকজন জানান, ক্ষিতিশকে লোহার রড ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। এতে তাঁর হাত-পা ভেঙে যায়। তাঁর মুখমণ্ডলে, বিশেষ করে চোখের নিচে, গভীর ক্ষত দেখা যায় বলেও তাঁরা দাবি করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর মাথার তালুতে ধারালো দা দিয়ে চারটি কোপ দেওয়া হয়েছিল। মাথার গভীর ক্ষত থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন তাঁরা। তবে মৃত্যুর সঠিক কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। ‘তখনও কথা বলতে পারছিলেন’, বললেন নিহতের স্ত্রী: সুলেখা মণ্ডল বলেন, “স্বামীকে মারধর করার খবর পেয়ে বিলে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করি। তখনও তিনি কথা বলতে পারছিলেন। তিনি আমাকে জানান, বিশ্বনাথের ঘেরের কর্মচারী গফ্ফার, বিশ্বনাথ ঘোষ, শিমুল ঘোষ, হাবিবুর গাজী, ইব্রাহিম খাঁ, সমর ঘোষসহ ১৫–২০ জন মিলে তাঁকে মারধর করেছেন। তাঁর মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়েছে এবং হাত-পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। পরে প্রতিবেশীদের সহায়তায় তাঁকে তালা হাসপাতালে ভর্তি করি। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা ১২টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।” স্বামীর মৃত্যুর ঘটনায় শোকাহত সুলেখা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনগত প্রতিকার প্রত্যাশা করছেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু: তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডা. সিরাজুল ইসলাম বলেন, শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে ক্ষিতিশ চন্দ্র মণ্ডলকে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলছিল। এর মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়। চিকিৎসকের বক্তব্য অনুযায়ী, উন্নত চিকিৎসার জন্য স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাঁকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে পুলিশ: তালা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহসিন আলী বলেন, খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির জন্য মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযুক্তদের বক্তব্যও পাওয়া সম্ভব হয়নি। সুষ্ঠু তদন্তের অপেক্ষা: মাছ চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে ক্ষিতিশ চন্দ্র মণ্ডলের মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ, হামলায় কারা জড়িত ছিলেন এবং কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা জরুরি। নিহতের স্ত্রীর অভিযোগ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে ঘটনার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা প্রয়োজন। একজন মানুষের মৃত্যুতে তাঁর পরিবারের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। এখন নিহতের পরিবারের প্রত্যাশা, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ ঘটনায় মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযুক্তদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।