
শাহেদ আহমেদ,
সাতক্ষীরা:
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ব্রহ্মরাজপুর ইউনিয়নের বড়খামার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের জমি থেকে প্রায় ১০টি গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় মুসল্লি ও বাসিন্দাদের মধ্যে। তাঁদের অভিযোগ, মসজিদের জমিতে থাকা গাছ কাটার ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। এদিকে, গাছ কাটার ঘটনায় স্থানীয় পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে মসজিদের জমি থেকে বিভিন্ন আকারের প্রায় ১০টি গাছ কেটে ফেলা হয়। এর মধ্যে চারটি বড় আকারের মেহগনিগাছ ছিল বলে দাবি স্থানীয়দের। তাঁদের ধারণা, কাটা গাছগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩০ হাজার টাকা। তবে স্থানীয়দের কাছে বিষয়টি কেবল কয়েকটি গাছ কেটে ফেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের উদ্বেগ, দীর্ঘদিন ধরে বেড়ে ওঠা গাছগুলো কেটে ফেলায় এলাকার সবুজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি মসজিদের জমির গাছ সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা এবং গাছ কাটার সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মসজিদের জমিতে শতাধিক গাছ, কাটার ঘটনায় উদ্বেগ স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বড়খামার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের জমিতে ১৪টি মেহগনি, ছয় থেকে সাতটি আম, দুটি লিচু ও একটি সফেদাগাছসহ শতাধিক গাছ রয়েছে। তাঁদের দাবি, জমিটি দান করেছিলেন প্রয়াত মহাতাব সরদার। স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে মসজিদের জমিতে বেড়ে ওঠা গাছগুলো এলাকার সবুজ পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব গাছ শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই বাড়ায় না, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, ছায়া প্রদান এবং পাখিসহ বিভিন্ন প্রাণীর আশ্রয় তৈরিতেও ভূমিকা রাখে। এ কারণে একসঙ্গে একাধিক গাছ কেটে ফেলার অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, মসজিদের জমি থেকে গাছ কাটার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হলো, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছিল কি না। তবে গাছ কাটার ঘটনায় পরিবেশের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের জন্য কাটা গাছগুলোর প্রজাতি, বয়স ও আকার সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। গাছ শুধু কাঠ নয়, পরিবেশ রক্ষারও অন্যতম অবলম্বন গাছ মানুষের জীবন ও প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। একটি গাছ বেড়ে উঠতে বছরের পর বছর সময় লাগে। বড় গাছ ছায়া দেয়, বাতাসের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং বিভিন্ন পাখি ও প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে গরমপ্রবণ এলাকায় বড় গাছের উপস্থিতি মানুষের স্বস্তি বাড়াতে এবং স্থানীয় পরিবেশকে তুলনামূলক শীতল রাখতে সহায়তা করে। অন্যদিকে, নির্বিচারে গাছ কাটা হলে কোনো কোনো এলাকায় ছায়া কমে যেতে পারে এবং পাখিসহ বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হতে পারে। বড়খামার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের জমি থেকে গাছ কাটার অভিযোগ তাই শুধু আর্থিক ক্ষতির প্রশ্ন নয়; এটি বৃক্ষ সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও সামনে এনেছে। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ কেটে ফেলার পর সেখানে নতুন চারা রোপণ করা হলেও আগের গাছের সমপরিমাণ ছায়া ও পরিবেশগত সুবিধা ফিরে পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। এ কারণে বিদ্যমান গাছ সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন ছাড়া গাছ কাটা থেকে বিরত থাকা পরিবেশ রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি মসজিদের জমিতে অবশিষ্ট গাছগুলো রক্ষায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রতিবাদে জড়ো হন ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষ গাছ কাটার ঘটনার প্রতিবাদে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) জুমার নামাজের পর মসজিদের মুসল্লি ও স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনাস্থলে জড়ো হন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, এ সময় প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বড়খামার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি আব্দুল গফ্ফার, সহসভাপতি বাবুর আলী, সদস্য নজরুল ইসলাম শেখ, যুব কমিটির সভাপতি মুহিদুল ইসলাম, মসজিদ কমিটির সদস্য নজরুল সরদার, অর্থ সম্পাদক বজলুর রহমান ও আব্দুস সাত্তারসহ স্থানীয় মুসল্লিরা। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ইউপি সদস্য খুরশিদ আলম এবং স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্য পদপ্রার্থী জুলফিকার আলী। প্রতিবাদে অংশ নেওয়া স্থানীয়রা মনে করেন, মসজিদের জমি ও গাছপালার বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গাছ কাটার পেছনের কারণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। প্রশাসনকে অবহিত, ঘটনাস্থল পরিদর্শন পুলিশের মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আনিছুর রহমান জানান, গাছ কাটার খবর পেয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অর্ণব দত্তকে ফোন করে বিষয়টি অবহিত করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইউএনও বিষয়টি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) জানান। পরে সদর থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মেহেদী হাসান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। আনিছুর রহমান আরও জানান, বিষয়টির সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত কাটা গাছগুলো ঘটনাস্থলেই রাখা হবে। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন। পুলিশের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের বিষয়টি জানা গেলেও তদন্তের ফলাফল বা অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের দাবি, জমির মালিকানা ও গাছের ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা হোক। পাশাপাশি গাছ কাটার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমতি বা বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হোক। কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, পাওয়া যায়নি তাঁদের বক্তব্য স্থানীয় কয়েকজন মুসল্লি ও বাসিন্দা গাছ কাটার ঘটনায় আব্দুর রহিম বাবু, তাঁর বড় ভাই সেলিম গাজী এবং জেলা তাঁতী লীগের সম্পাদক মনিরুজ্জামান তুহিনের নাম উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের মোবাইল নম্বর পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া না যাওয়ায় তাঁদের দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করাই হবে যথাযথ পদক্ষেপ। গাছ সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগের দাবি বড়খামার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের জমি থেকে গাছ কাটার অভিযোগ স্থানীয় পর্যায়ে বৃক্ষ সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে। স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি মসজিদের জমিতে থাকা অবশিষ্ট গাছগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জমিতে থাকা গাছ সংরক্ষণে সচেতনতা ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। গাছ কাটার প্রয়োজন দেখা দিলে জমির মালিকানা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি এবং প্রযোজ্য আইন ও বিধিবিধান যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে মসজিদের জমির দলিল, গাছপালার তথ্য এবং ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত নথি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিরোধ এড়ানো সহজ হতে পারে। যদি তদন্তে গাছ কাটার ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম বা আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের অপেক্ষায় এলাকাবাসী বড়খামার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের জমি থেকে গাছ কাটার অভিযোগে স্থানীয় মুসল্লি ও বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাঁদের প্রত্যাশা, প্রশাসন নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করবে এবং অভিযোগের সত্যতা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। স্থানীয়দের কাছে এ ঘটনার সুষ্ঠু নিষ্পত্তি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ মসজিদের জমিতে অবশিষ্ট গাছগুলো সংরক্ষণ করা। কারণ, একটি গাছের মূল্য শুধু তার কাঠের বাজারদরে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিবেশের ভারসাম্য, মানুষের স্বস্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবুজ পরিবেশ রেখে যাওয়ার দায়িত্ব। এখন এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, গাছ কাটার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে, অভিযোগের যথাযথ নিষ্পত্তি হবে এবং মসজিদের জমিতে অবশিষ্ট গাছগুলো রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে গাছ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট সবাই আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন।